বিষাদবিন্দু আনন্দসিন্ধু♥
                       (০৪)
                  ♦ কাল ♦মানবর্দ্ধন পাল

বিষাদবিন্দু আনন্দসিন্ধুর এপর্বের শিরোনাম কালো নয় 'কাল'। অর্থাৎ এর উচ্চারণ ও-কার মাত্রিক স্বরান্ত নয়-- ব্যঞ্জনান্ত। এই 'কাল' শব্দটিও আমাদের মাতৃভাষায় বহুমাত্রিক অর্থ ধারণ করে। কালের সাধারণ অর্থ 'সময়'-- আমরা সবাই জানি। তাই রবীন্দ্রনাথের গানে পাই : "দুই হাতে-- কালের মন্দিরা-যে সদাই বাজে, ডাইনে-বাঁয়ে দুই হাতে---" কিংবা কবিতায় বলেছেন : "কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও? অথবা " যায় যদি লুপ্ত হয়ে, থাকে শুধু থাক একবিন্দু নয়নের জল/ কালের কপোল তলে শুভ্রসমুজ্জ্বল তাজমহল।" যখন বলা হয়, লোকটির তিন কাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে তখন আমরা বুঝি-- শৈশব, যৌবন ও প্রৌঢ়ত্ব কাটিয়ে তিনি বার্ধক্যে উপনীত।  এসবই কালের পরিক্রমণ এবং  সময়ের প্রবহমান গতিধারা। 

পৃথিবীর সব ভাষার ব্যাকরণে কালের এই অন্তহীন প্রবহমান গতিধারাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে-- অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ-- এসবই আমরা জানি। এরও আছে বারোটি উপবিভাগ-- তাও আমাদের অজানা নয়। কিন্তু এই 'কাল' শব্দটিরও-যে কত কারিগরি,কারিশমা ও অর্থের রূপ-রূপান্তর তা আমাদের বিস্ময় জাগায়। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় একবার ঠাট্টার ছলে বলেছিলেন, "বাংলা ভাষার মজাটাই এখানে যে, 'আসছি' বলে নিশ্চিন্তে চলে যাওয়া যায়।" এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অনেক শব্দের মধ্যেই লক্ষ করা যায়। যদি বলি-- সে কাল এসেছিল আবার কাল আসবে। তখন কিন্তু নিকট অতীত এবং নিকট ভবিষ্যত দিনটির কথাই বোঝায়। আবার শব্দটিতে সপ্তমী বিভক্তি যুক্ত করে দ্বিত্ব করলে সুদীর্ঘ সময়ের ব্যাপ্তি বোঝায়। যেমন নজরুলের কবিতায় আছে : "দিনেদিনে শুধু বাড়িতেছে দেনা শোধিতে হইবে ঋণ।"

এই 'কাল' শব্দটির সামনে-পেছনে নানা শব্দ যুক্ত করে অনেক নতুন শব্দ তৈরি করা যায়। এর ফলে অর্থপ্রকাশেও ঘটে বিচিত্রবিধ ভিন্নতা এবং রূপরূপান্তর! অর্থের পরিবর্তনে শব্দের নতুন জন্মান্তর হয়। কয়েকটি উদাহরণই দিই :
কালগ্রাস (মৃত্যুর মুখে পড়া)।
কালঘাম (অত্যধিক পরিশ্রমে প্রাণান্তকর অবস্থা)।
কালঘুম (যে-ঘুম ভাঙে না, মৃত্যু)।
কালপেঁচা (অশুভ পেঁচার ডাক)।
কালবৈশাখী (চৈত্রমাসের বৈকালিক ঝড়)।
কালসিটে (আঘাতের কালো দাগ)।
কালনেমি (রাবণের চক্রান্তকারী মামা)।
কালকুণ্ঠ (যম, মৃত্যুদূত)।
কালকূট (যা জীবনীশক্তি নষ্ট করে, তীব্র বিষ, গরল)।
কালকেতু (শাপভ্রষ্ট ইন্দ্রপুত্র নীলাম্বর, পুরাণে বর্ণিত ব্যাধপুত্র)।
কালগঙ্গা (কালিন্দী নদী, যমুনা।)
কালচক্র (সময়ের অনন্ত আবর্তন)।
কালচিহ্ন (মৃত্যুর লক্ষণ)।
কালচিন্তক (যে সময়ের শুভাশুভ চিন্তা করে, জ্যোতির্বিদ)।
কালভৈরব (কালরূপী যে ভৈরব, শিব)।
কালপাশ (মৃত্যুর বন্ধন)।
কালপুরুষ (যমরাজের ভৃত্য)।
কালবেলা (অশুভ সময়, জ্যোতির্বিদদের মতে সপ্তাহের প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় অশুভ থাকে)।
কালসাপ, কালনাগিনী, কালভুজঙ্গ ইত্যাদি শব্দের অর্থ জীবনঘাতী ছোট্ট বিষধর সাপ। পদ্মাপুরাণ বা মনসামঙ্গলে যে-সাপের দংশনে বাসরঘরে লক্ষ্মীন্দরের মৃত্যু হয়েছিল।

এই 'কাল' শব্দটি বুকে ধারণ করে বাংলা সাহিত্যে বেশকিছু চমৎকার বই আছে। শব্দটি মনে হলেই করোটিতে বিদ্যুৎচমকের মতো মনে পড়ে যায় তারাশঙ্করের নদীভিত্তিক উপন্যাস 'কালিন্দী' এবং শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়য়ের গুপ্তবংশ নিয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস 'কালের মন্দিরা'র কথা। সমরেশ মজুমদারের 'কালবেলা'ও বাংলা সাহিত্যের একটি নামজাদা উপন্যাস।  আনিসুজ্জামানের আত্মস্মৃতিমূলক বইটির নাম 'কাল নিরবধি' আর যতীন সরকারের একটি প্রবন্ধগ্রন্থের নাম 'কালের কপোল তলে'। কবি শামসুর রাহমানের স্মৃতিকথাটির নাম 'কালের ধুলোয় লেখা'। আল মাহমুদের একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের নাম 'কালের কলস'। এখন 'কালের কণ্ঠ' ও 'সমকাল' নামে দুটি বিখ্যাত দৈনিক পত্রিকা তো আছেই-- বিগত ষাটের দশকে কবি সিকান্দর আবুজাফরের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো বিখ্যাত সাহিত্য-মাসিক 'সমকাল'।

কাল নিয়ে যত কথাই বলি, কালরাত্রির কথা না-বলা পর্যন্ত কথা যেমন ফুরোবে না, নটেগাছটিও মুরোবে না! কালরাত বা কালরাত্রি অশুভ রাত, করাল রাত, মৃত্যুমথিত রাত, বিভীষিকাময় রাত, যে-রাতে মৃত্যু ঘটে ইত্যাদি। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে বিয়ের রাত থেকে তৃতীয় রাতটি এখনও 'কালরাত্রি' হিসেবে গণ্য করা হয়। সেদিন বরকনেকে আলাদা রাখা হয়-- একে অপরের মুখদর্শন করাও নিষিদ্ধ। মনসামঙ্গলে বাসররাতে চাঁদ সওদাগরের পুত্র লক্ষ্মীন্দরকে সর্পদংশনের ঘটনার আলোকেই এই সংস্কার আবহমান কাল ধরে প্রচলিত। তবে একালের বাঙালির জীবনে কালরাত্রির তাৎপর্য সম্পূর্ণ অন্যরকম। তা ব্যক্তিক বা সামাজিক নয়-- জাতীয় বা রাষ্ট্রিক। আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারায় স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বলগ্নে অপারেশন সার্চলাইট নামে একাত্তরের পঁচিশে মার্চ রাতে বর্বর পাকবাহিনি এদেশে ব্যাপক গণহত্যা শুরু করেছিল। সেই হত্যাযজ্ঞের রাতটিকেই আমরা বলি 'কালরাত'। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন গণহত্যার রাত। তাই জাতিসংঘ ও বিশ্বনেতৃবৃন্দের কাছে আমাদের দাবি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো পঁচিশে মার্চ তারিখটিকেও আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের মর্যাদা দেওয়া হোক।