কবি বিকাশ সরকারের "হ্যালুসিনেশন সিরিজ" আমাদের হ্যালুসিনেশন মুক্ত করে।সন্দীপ সাহু
কবি বিকাশ সরকারের "হ্যালুসিনেশন সিরিজ" আমাদের হ্যালুসিনেশন মুক্ত করে।
সন্দীপ সাহু
-------------------------------------------------------------------
হ্যালুসিনেশন এক ধরণের মনস্তাত্ত্বি বিষয়। প্রেমহীনতায় প্রেমিকার প্রতি প্রেমিকের মনস্তাত্ত্বিক
প্রতিক্রিয়া, বর্তমান সমাজ সভ্যতার স্বরূপ "হ্যালুসিনেশন সিরিজ"-এর কবিতায়গুলিতে হ্যালুসিনেশনের ব্যাঞ্জনায় এক অভিনব শৈলীতে প্রকাশ পেয়েছে। অলঙ্কার শাস্ত্রে ব্যাজস্তুতি অলঙ্কারের কথা পাই। এই হ্যালুসিনেশন-এর ব্যাঞ্জনা অনেকটা ব্যাজস্তুতি অলঙ্কারকে মনে করায়।
প্রেম শেষ হলে আর কি পড়ে থাকে? অন্তিম আশাটাকেও শেষ করে দিতে হয়। চুম্বনই প্রেমের
পরম প্রকাশ। "অভিশাপ দাও, এই শীতে, শেষবারের মতো চুম্বনের পর,/ রহস্যজনক আমার মৃত্যু হয়ে যাক।" বসন্ত প্রেম, শীত বিপরীত। রজনীগন্ধা, জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের পথ পচে ওঠে। শেষ চুম্বন শেষ হওয়ার পর। অভিশাপে। প্রেম তো রহস্যই। রহস্যের পরতে পরতে থাকে প্রেম-সৌন্দর্য। রহস্য শেষ হলেই তার কুৎসিত হয়ে পড়ে। মারা যায়। কবি বিকাশ সরকার রহস্যজনক মৃত্যু চান। কবি অতীত জীবন্ত প্রেম স্মৃতিতে রেখেচলে যেতে চান অনন্ত চির রহস্যের দেশে। মৃতসঞ্জীবনী রজনীকান্ত সঙ্গীত, গীতবিতান "কারো স্পর্শেই যেন প্রাণ নাহি ফেরে ..."। কবি "প্রেম শেষ হলে প্রাণ ফিরে পেয়ে যন্ত্রণা পেতে চান না।
প্রেম চশমাই। এতে জীবন রঙিন হয়ে ধরা দেয়। প্রেম শেষ হলে চশমা ঝরে পড়ে। "আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে বিন্দু-বিন্দু দীর্ঘশ্বাসগুলি"। জীবন-পথ শেষ হয় শ্মশানে। জীবন শেষ হলে অপেক্ষার কোনো মানে নেই। "ভিড়ের দিকে তাকিয়ে তার যে অপেক্ষা রয়েছে তা বুঝবে কে!" তাই কবির পৌষমেলায় যাওয়া হয়নি "কোনদিন কি হবে?"
প্রেম ছোটোগল্পের মতো। শেষ হয়েও শেষ হয় না।"বেঁচে উঠল তারা / তারাও এসে দাঁড়িয়েছে এই মারিজুয়ানাটিলায়।" এই মারিজুয়ানা নিলাকে "ভালোবাসার স্তুপ" ভ্রম করে এই বেঁচে ওঠা ভালোবাসাগুলো জমা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা ছিল মহেঞ্জোদারো। "সেই টিলায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তাই নিজেকেই পুড়ে যেতে দেখি"। ভালোবাসারও সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। " আমার হৃদপিণ্ডে চাকু দিয়ে সে লিখে দিচ্ছে লিরিক"। প্রেম অমৃত। তাই নিশ্চিন্তে বিষ পান করে। "তবু তাকে ভালোবেসেছি খুব"। এই কারণেই প্রচণ্ড অভিমানে ভালোবাসার মানুষের সামনে "তুলে দেবো নিকষ কালো পাথরের এক বিচ্ছেদপ্রাচীর"। প্রচণ্ড ভালোবাসায় তবুও কবি "শুধু চাকুখানা রেখে দেবো যাতে সে ফের কাটতে পারে"। প্রেমিকারাও চলিত হয়। "মাঠের কোথাও পড়ে আছে মেয়েটির রক্তমাখা পেরেক"। সেই যন্ত্রণায় কবি "আমার ভিতর আমি নিজেই হেঁটে যেতে থাকি মাঠে"।
ভালোবাসা একটি সুর। জীবন পিয়ানোর মতো। পিয়ানোতে সেই সুর তুলতে হয়। এই পিয়ানো বাজানো শেখা ছাড়া ভালোবাসার সুর তোলা যায় না। কবির সরল স্বীকারোক্তি "পিয়ানো বাজাতে যে রোগ লাগে, শোক লাগে/ থুতু আর লালা লাগে, অশ্রু ও কুষ্ঠকীট লাগে / সেসব সম্পত্তি আমাদের নেই"। এই কারণেই ভালোবাসা হ্যালুসিনেশন হয়ে ছুটিয়ে মারে মরিচিকার মতো, ধরা দেয় না কখনো।
এখন সমাজ সভ্যতার যা কিছু সুন্দর দেখা যায়, সবটাই হ্যালুসিনেশন। যারা দেখে তারা সম্মোহিত। বাস্তব হলো "নদীটির জলে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে চিতাভস্মমাখা চাঁদ।" "শ্মশানমন্দিরের চাতালে" পড়ে
থাকা জোৎস্নাই উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। একই ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে এই চরণে " পাশে শুয়ে চুপচাপ দেখি শুধু নদীটির ক্ষয়"। আমরা অনেকেই হ্যালুসিনেশনে ভেসে যাই সমাজ সভ্যতার ক্রম ধ্বংসছবি চুপচাপ দেখে যাই নির্লিপ্ত ভাবে।
আজ সারা বিশ্বে অন্ধকার রাজত্ব করছে। বিশ্ব ভরে গেছে ছায়াগাছে। ফলে জেগে উঠছে " জিঘাংসাপরায়ণ যত স্তুপ মেঘ"। গৌতম বুদ্ধ সহ সমস্ত মহামানবগণ ওই ছায়ায় ঢাকা পড়েছেন। তাই "বিকেলের লক্ষ কোটি নখ" " অম্লবৃষ্টি" পাঁচ করে " বেলাবেলি আমাকে ও নদীকে আজ খুণ করে গেল"।
এই খুণ হ্যালুসিনেশনে ঢাকা পড়েছে। আমাদের অসেচতন করে অন্ধকার খেয়ে চলেছে বিশ্বকে।
পুঁজিবাদী বিশ্ব সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার মন্ত্র উচ্চারণ করেছিল একদিন। আজ শোষণে শোষণে ছিবড়ে হয়ে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসমান বিশ্ব সর্বহারা জনগণকে অমানুষ বানাতে চায়, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। তবুও মানুষ একেবারে বিবেকশূন্য হয় না। "বেলুনবাঁশি আর ঝুমঝুমির শব্দ ভেসে এসেছিল / প্রেমিকির ফুলে ওঠা তলপেট থেকে / খুরে শান দিতে দিতে সেও তো আনমনা হয়েছিল / ছোট্টো একটা ভ্রুণের ফিসফিসে"।
প্রমান হয় অন্ধকার যতই ঘন হোক না কেন? বিবেককে যতই খুণ করা হোক না কেন? অন্ধকারেরও আলো থাকে, বিবেক মরেও মরে না। হ্যালুসিনেশনের আড়ালে সত্য মূর্ত হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব-খুদায় সৌন্দর্য মরছে। পাখির গান, ঝিঁঝিঁর ডাক, হলুদ প্রজাপতিতে কবি বিকাশ সরকারের খিদে ভুলে যাওয়ার হ্যালুসিনেশন আমাদের চেতনাকে সচেতন করে। এই সচেতনতাতেই পৃথিবীর মঙ্গল। তাহলেই পৃথিবী সৌন্দর্যে ভরে উঠবে আবার।
এর জন্ম দরকার আমাদের "জঙ্গলকর্মী" হওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করা।
আজ বিশ্ব প্রেমহীন হয়ে মরু হয়ে চলেছে। মরুতে বেঁচে থাকে শুধু ক্যাকটাস। তাই কবির বলে ওঠেন, " আকাশের দিকে মাথা তুলেছে সহস্র হাত তুলে মহাক্যাকটাস"। কবি আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, "রতিবুভুক্ষু পিশাচেরা দল বেঁধে ঘোরে চন্দনের টিকা পরে / ফার্সা দিয়ে প্রতিদিন কুপিয়ে কাটে তারা"।
এই হতাস-বিশ্বেও কবির প্রিয়জন যখন ," তুমি চোখে ভরে নিয়ে এলে এই গ্রীষ্ম-অবকাশে! / আমার আর দিঘা যাওয়া হলো না হলো না"। প্রেম বেঁচে ওঠে। এই বেঁচৈ ওঠার কথা আবির ধ্বনিত হয়েছে ," তুমি যন্ত্রণায় বুকে রাখো মাথা, আমি ফিসফিস করে বলি / 'থাকো'"।
আজ বিশ্ব-মানবিকতা শবে পূর্ণ। তাই "শববাহী অ্যাম্বুলেন্সের বিকট শব্দে হারিয়ে গেছে খোয়াইয়ের সব বৃষ্টিপাত"। তাই " আর প্রজাপতির বদলে চুপচাপ আধপোড়া ফুলে বসে আছে / আত্মহত্যার চুক্তিপত্রগুলি"। এই মরু-সভ্যতায় আত্মহত্যার কারণ বেড়ে চলে। আত্মহত্যার মিছিল ডাক দেয়। তাই " আজও একটি আত্মহত্যা সম্পূর্ণ হলো না / তার আগেই আরেকটি ফাঁসি বাকল 'আয়'"।
"উলঙ্গ রাজা"-র সেই শিশুটির মতো কবি বিকাশ সরকারেরও একটি বালক আছে। "সেতারের ভিতর বসে বসে বালক সমস্ত দিন / ভাবছে নদীর কথা"।
এছাড়াও শান্তিনিকেতন শব্দটি বার বার এসেছে কবির কবিতায়। শান্তিনিকেতন শব্দটি একটি দর্শনের ব্যাঞ্জনা। এই দর্শনকে না জেনেই আমরা অন্ধভক্তের দল হেলুসিনেট হই। এই হ্যালুসিনেশন কাটাতেই সুন্দর ভাবে কবি শব্দটিকে বিশেষ ব্যাঞ্জনায় ব্যবহার করেছেন। সেই সঙ্গে কবি তার প্রিয় স্নেহের চরিত্র 'কচি'-কে নূতন ব্যাঞ্জনায় বার বার এনেছেন।
কবি বিকাশ সরকারের " হ্যালুসিনেশন সিরিজ" আধুনিক কাব্যশৈলীতে আমাদের বাঙালী জনসমষ্টিতে প্রচলিত আধুনিকতম শব্দ ও ব্যাঞ্জনা সহজ সিবলীল ভাবে এসেছে। অন্যান্য পণ্ডিতমন্য কবির মতো এই কাব্যগ্রন্থকে ভারাক্রান্ত করেননি।
সবচেয়ে বড় বিষয় উপযুক্ত জায়গায় থামার বোধ।
এই কারণে প্রত্যেকটি কবিতা ব্যাঞ্জনার বিদ্যুচ্চমকে আমাদের চিন্তা চেতনাকে শুধু ছোঁয় না, নাড়া দেয়।
হ্যালুসিনেশন থেকে আমাদের মুক্তি করে।
কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায়(কবিকথা) কবি বিকাশ সরকার বলেছেন, " বিষাদ ও অনিদ্রার আত্মহত্যাকামী বিভ্রান্তিকর দিনগুলির যাপন করা আছে"। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ এর মধ্যে লেখা। কবির সতেরো থেকে বাইশ বছরের মধ্যে লেখা। এই কিশোর কবি বিকাশ সরকারের পরিণত প্রতিভার স্ফূরণ আজকে ২০২১ এর শেষেও পাঠককে বিস্মিত করবেই বলাবাহুল্য।
0 Comments