মেঘমিতার কাছে মৃত্তিকাঋণ স্বীকারেই কবি অপাংশু দেবনাথ-এর মোক্ষ।সন্দীপ সাহু
মেঘমিতার কাছে মৃত্তিকাঋণ স্বীকারেই কবি অপাংশু দেবনাথ-এর মোক্ষ।
সন্দীপ সাহু
-----------------------------------------------------------------
মেঘমিতাকে উদ্দেশ্য করে কবি অপাংশু দেবনাথ এই পত্রকাব্যে, সমকালীন প্রেক্ষাপটে তাঁর প্রেমানুভূতি ও মৃত্তিকাঋণ, দুটোকেই পরস্পরের পরিপূরক হিসাবে উপস্থাপিত করেছেন। মৃত্তিকা ঋণ স্বীকার না করলে ব্যক্তিগত কোনো সঠিক বোধ গড়ে ওঠে না।
মেঘমিতা কোনো রক্তমাংসে সীমায় থাকা কোনো চরিত্রর নয়। মেঘের সঙ্গে মৃত্তিকার সম্পর্ক অভিন্ন। সেই মেঘের মিতা অর্থাৎ মৃত্তিকারও মিতা।
মেঘকে মৃত্তিকাকে ধরে রাখে এই মিতা। এই মিতা হলো সমাজ সভ্যতার ইতিকথা। এই ইতিকথার কাছে মৃত্তিকাঋণ স্বীকার মানে মানব সমাজের কাছে ঋণ স্বীকার করে, এগোবার কথা কবি অপাংশু বলেছেন এই পত্রকাব্যের পরতে পরতে।
এই পত্রকাব্যের সূচনায় দেখতে পাই কবি অপাংশু নিজের সত্তাকে অতিক্রম করে বৃহত্তর মানব সমাজে নিজেকে উত্তীর্ণ করেছেন, একবারে আদি যুগ থেকে। প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মুখ ছিল মঙ্গোলীয় টাইপের।"মঙ্গোলীয় মুখ দেখে কেটে গেছে সিঁড়ি ভাঙা/অংকের মতোন বাইশ জনমের ..." মঙ্গোলীয় মুখ, বাইশ জনম--- সবটাই সমাজ প্রেমের প্রাথমিক ছবিকে ইঙ্গিত করে।
এর সঙ্গেই মিশে আছে ত্রিপুরী প্রেমিকার প্রতি কবির ব্যক্তিগত প্রেমানুভূতি। আজ জীবনের মধ্যগগনে দাঁড়িয়ে কবি বাল্য থেকে আজ পর্যন্ত সোনালী রোদকে জাবর কেটে মাখতে ও আমাদের মাখাতে চাইছেন। আসুন আমরা পড়ে নিই," ...বাইশ জনমের পুণঃ/ পাঠজীবন ..."। পড়ে জানতে পারি," ...আবাল্য স্বপ্নবিলাসী না বলা/ সমস্ত কথা," "বিবর্ণ বিকেলের ডানা ঝাপটানি কিংবা/ অসময়ের অফুরান মেঘলা যন্ত্রণাও"। সব কিছু নিয়ে কবি "নিঃশর্ত সমর্পন করি ঝর্ণার কাছে।" এই ঝর্ণাই তো মানসী ত্রিপুরী সুন্দরী। এই সমর্পনে যে প্রেমসঙ্গীত সুর তুলেছিল," মনে পড়ে স্বপ্নীল সিঁড়ি বেয়ে শিখরে উঠা/ ও নামার কথা..."। কবির মনে পড়ে যায় মেঘমিতার কথা," ট্রেনিং ফেরৎ সীমান্তরক্ষী বুঝি। এত ছোট/ কেশ- বিন্যাসে প্রার্থিত মানুষ নও আমার"। সৈন্য কখনো প্রেমিক হিসেবে কাম্য হতে পারে না। সমাজের ক্ষেত্রেও না। কারণ সমাজকে অবদমন করে সৈনিক।
কবি তাঁর ব্যক্তিগত প্রেম-উড়ান সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন," ...উড়ি স্বপ্নের নীল/ আকাশে---যেখানে সম্রাট আমি ত্রিভূবনের।" কিন্তু ব্যক্তিগত এই রোমান্স স্থায়ী হয় না। কবি বাস্তব-টান অগ্রাহ্য করতে পারেন না।" বেদনার না'য়ে মাঝি হয়ে" কবি "পাঁজরে মৃত্তিকা জড়িয়ে" জেগে থাকেন।ব্যক্তি প্রেম, ব্যষ্টি প্রেমের পথে হাঁটলো। সমাজ সভ্যতা মানুষকে এগোতে হয়,"অসংখ্য দংশন সহ্য করেই তো" অনন্তের পথে।
এই পথেই কবি নিজের ছায়ার ভেতর দাঁড়িয়ে অনুভব করেন,"রূপোলী রহস্যে জেগে ওঠে প্রকৃতি ও প্রেম।"
কবি আত্মপ্রেম-সুখে নিমজ্জিত থাকতে চান না। তিনি জানেন সামাজিক প্রেমেই ব্যক্তি প্রেম নিহিত। প্রকৃত ব্যক্তি প্রেম ব্যষ্টি প্রেম ছাড়া হতে পারে না। তাই," খড় কুটো পোড়ানোর উত্তাপ পোহানোর মতো/ আমাকে ঘিরে মিছিলের ক্ষণ-বিশ্বাসী মুখ"। মিছিল নির্মান দাবি করে। তাই কবি অনায়াসে লিখতে পারেন, " উত্তাপহীন, নির্মেদ পথে হেঁটে যাই/ নির্মান হাওয়া গায়ে মেখে, মেঘবানী শুনে"। মেঘ তো সৃষ্টির সৃজক।
মেঘবানী সৃষ্টির কথাই বলে। কবি আত্মপ্রেমকে ব্যষ্টিপ্রেমে মিশিয়ে অভিষ্ট নির্মান পথে এগোতে চান। এই ব্যষ্টি প্রেমের আত্মপ্রেম খোঁজা, উন্নত বিজ্ঞান সম্মত সাম্যবাদী দৃষ্টিকোণ ছাড়া সম্ভব নয়। তাই মেঘমিতাকে মৃত্তিকাঝণ স্বীকার করে এই পত্রকাব্যে লিখতে পারেন, " অগুনন উত্তাপ মিলিত হলে এক দীর্ঘ/ মিছিল হয়..."। এই মিছিলে কবি ও মেঘমিতা দু'জনেই আত্মস্থ। " স্পষ্ট অভিমত/ ছিলো তোমার একাকী উজ্জ্বল মিছিল তুমি;/ মিছিল আমিও, গলিপথ জানে মর্ম কথা"। এই মেঘমিতাকে কবির
প্রেমিকা আর্থাৎ ব্যক্তিপ্রেমের আধার ভাবি বা সমাজ ভাবি, দু'দিন থেকেই সাম্যবাদী আদর্শের প্রতিফলন দেখতে পাই। এই আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে চূড়ান্ত ভাবে, "ঈশ্বর নয়, মানুষের বিশ্বস্থ মুখ দেখি/ অর্ঘ্য সমর্পন করি, হৃদয়উৎসারিত/ দিগন্ত প্রসারী ওই নির্মল আলো-সম্মুখে"। কবি রবিকবির গানকে অনুসরণ করে সহজেই বলেন, "মৃত্যুর সরনি ধরে এগোতে থাকি একা..."। বর্তমান সমাজিক প্রেক্ষাপটে সমাজ পরিবর্তনের ডাকে সাম্যবাদীদেরই একাকী হাঁটতে হয়। মেঘমিতা ও সমাজকে সঙ্গে করেই।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন রঙের রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তঃসারশূন্যতা কবি অপাংশু সমাজ অভিজ্ঞতায় সুন্দর ব্যক্ত করেছেন।এমন কী তথাকথিত সাম্যবাদী নামাবলী জড়ানো লোক ঠকানো লাল দলও কবির কটাক্ষ থেকে মুক্তি পায়নি। "সব পথ লাল, সবুজ, গেরুয়া অন্যরূপে,/ছলনা চলে বৃত্ত ছাতা ছাউনিমুখী হয়"। সমাজ জীবনের এই অসুখকে কবি যেমন কোনো মতেই এড়াতে পারেন না, তেমনি বহেমিয়ান জীবনের রোমান্টিক আহ্বান তাকে ভাসাতে চায়।"তবুও মাঝে মাঝে কেন/স্বেচ্ছা নির্বাসন চাই তোমার, আমারও তো/ চাই আত্মভোলা জীবন..."। এখানেই কবির সঙ্গে রেজিমেণ্টেড বিপ্লবীর পার্থক্য। তবে এই আকর্ষণ স্থায়ী হয় না। মৃত্তিকাঋণ ব্যক্তিগত মেঘমিতাই হোক বা সামাজিক সত্তার কাছেই হোক স্বীকার করলে, যে কোনো বস্তুমূলক দ্বন্দ্বিকের মতো
কবিও বলেন," হৃদয়ের ভেতর ক্রমাগত দ্বান্দ্বিক তাপে/ বাইরে বেরিয়ে আসতে চাই ..."
এই আত্মমগ্ন আত্মভোলা জীবন থেকে বেরিয়ে এসে মৃত্তিকাঋণ স্বীকার করাই প্রকৃত কবি-জীবনের লক্ষ্য। এই ঋণ স্বীকারের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়াতেই কবির মোক্ষ।
প্রচ্ছদ শিল্পী পুষ্পল দেবনাথের চিত্র নির্মান এই কাব্যগ্রন্থকে আকর্ষণীয় করেছে।
কাব্যগ্রন্থটি একযোগে স্রোত প্রকাশনা বইবাড়ি,আগরতলা, ভারতবর্ষ ও পারিজাত প্রকাশনী, ঢাকা, বাংলাদেশ থেকে প্রকাশ পেয়েছে ২০১৫ সালে। মূল্য ৮০ টাকা।
এই রকম একটি কাব্যগ্রন্থের প্রকাশক হিসেবে সুমিতা পাল ধর মহাশয়াকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়।
0 Comments