হারাধন বৈরাগীগ্রন্থ আলোচনা পদ্মশ্রী মজুমদারের উপন্যাস "দেওনদীর জল"
হারাধন বৈরাগী
গ্রন্থ আলোচনা
পদ্মশ্রী মজুমদারের উপন্যাস "দেওনদীর জল"
কথাকার পদ্মশ্রী মজুমদার তাঁর "দেও নদীর জল " উপন্যাসের কথামুখে বলেছেন-দেও---আমার জীবনে প্রথম দেখা নদী।দেওনদীকে দেখে বুঝেছি নদী কাকে বলে। আমার জীবনের সমস্ত সুখ- দুঃখ -পাওয়া না পাওয়ার সাক্ষী দেওনদী।তার কাছেই--প্রথম নেওয়া সময়ের পাঠ। আমার কলমে কখনও আমার মা, কখনও মেয়ে।তবে বর্তমান বইটিতে সমস্ত কিছু ছাপিয়ে উঠেছে-তার একটিই সত্ত্বা-সে মহাকাল।"
আমার মনে হয়েছে,এই কিছু কথার মাঝেই যেন লুকিয়ে আছে কবি থেকে কথাকার পদ্মশ্রীর উপন্যাসটির গর্ভধার,গর্ভযন্ত্রণা ও শরীরী বিভঙ্গ, ধরাঅধরা অতল বিতল সুতল ও রসাতল।মাত্র ৬৭পৃষ্ঠা কলেবরের এই উপন্যাসে কবি ও কথাকার পদ্মশ্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন কতটুকু মুন্সিয়ানা থাকলে মহাকাল কিংবা ব্ল্যাকহোলকে দুমড়েমুচড়ে নাতিদীর্ঘ নদীর সাথে একাকার করে একটা নাতিদৈর্ঘ্যের আঞ্চলিক উপন্যাস রচনা করা যায়।যেখানে কোন নরনারী মুখ্য চরিত্র হয়ে উঠেনি,মুখ্যচরিত্র হয়ে উঠেছে একটি নদী (নদ)দেও যার নাম।এই উপন্যাসে যাকে নদী বলা হয়েছে,সে মহাকাল নামক এক ধরাঅধরা চিন্ময় কিংবা হিরণ্ময়,রক্ত নয়,মাংস নয় এক সময়জল কিন্তু রক্তমাংসের মতোই মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ভালবাসা-ঘৃণা ,ভয়-অভয়ের আলোকিত -অনালোকিত সত্ত্বা কিংবা সত্ত্বা নয়।যার সাথে শ্রীহট্টের উদ্বাস্তু, বিবিধ জীবন জীবিকার মানুষের সুখ-দুঃখ ,হাসি-কান্না, ভালোবাসা-ঘৃণা,মান-অভিমান,জন্ম-মৃত্যু,সংসার-অসংসার,ধর্ম-অধর্ম,লৌকিক-অলৌকিক ,আচার-বিচার,সুসংস্কার-কুসংস্কার, জাতপাত, ,রাজনীতি,অর্থনীতি, সমাজনীতি,বিশ্বাস-অবিশ্বাস, দেহতত্ত্ব,পঞ্চতত্ত্ব,পরমার্ততত্ত্ব,লোকাচার,দেশাচার, সংস্কৃতি-অপসংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার-সাকার কিংবা নিরাকার। এখানে উপন্যাসিক একটা আঞ্চলিক সমাজশরীরের সকল নার্ভীকেন্দ্র মনসামঙ্গল খনারবচন ও পরমার্থতত্ত্ব-- বৈঠা করে কমলা,লাউগোসাই,পাপুর মাকে মাঝি করে অবন্তীকে হাল করে দেওনদীকে নৌকা করে মহাকালের বুকে ভাসিয়ে দিয়েছেন নৌকা।আর অসম্ভব মুন্সিয়ানায় সেই নৌকায় যাত্রী করেছেন অনিরুদ্ধ,রাণীবালা,সাধু,উষা,শ্রাবণী,কল্লোল,সীতাংশু, যুক্তিবাদী সংস্থার লোকজন,বনিক-বউ,সুপ্রভা,পরিমল,নয়ন,সুধা,বিমল,মীরা,সুবল, শ্রীনিবাস,স্বপ্না, নবীন, শ্যামল,অতসী--ও দেওতীরবর্তী কুমারঘাটের দশমীঘাট ও তৎসন্নিহিত মানুষজনকে!আর তাদের আত্মার সাথে বয়ে নিয়ে চলেছেন বারোমাস্যা তথা সকল লোকজ কৃষ্টি্য দেবদেবী সংস্কৃতি, অপসংস্কৃতি--।পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হবে দশমীঘাট যেন মহাকালের এক হা-করামুখ।এই উপন্যাসে লেখিকা নদী ও মহাকালকে সুতোর মতো পাকিয়ে দেওতীরবর্তী এক খণ্ডপারের শ্রীহট্টীয় লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতির এক আদর্শ রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। মা-মনসা যেন এখানে পাপুর মায়ের রূপধরে সমগ্র উপন্যাসে ধরাঅধরা মায়াকুহকের জাল বিস্তার করেছে।ভয়-অভয়ের আলোআঁধারিত এক সর্পঝাঁপির মতো ঢেকে রেখেছে সারা উপন্যাসের বুক।আর এই ঝাঁপির ভেতরই যেন চলেছে মনসামঙ্গল,বিপদনাশিনীব্রত,মঙ্গলা কীর্তন,কর্মপূজা,আট-আনাজ সংক্রান্তি,কার্তিকপূজা,নবান্ন,চরকপূজা প্রভৃতি বিবিধ পূজা পার্বণ ও লোকাচারের শৈলীময় স্বতস্ফুর্ত জীবনচর্চা।
উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ অবধি একের পর এক বিভিন্ন নামযুক্ত ও নামবিহীন পাত্রপাত্রী সহসা এসে আবির্ভূত হয়েছে,মনে হয়েছে চরিত্র গুলি যেন কোন রঙ্গমঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ করছে। পাঠক হঠাৎ খেই হারিয়ে ফের ফিরে আসে মূল অনুস্রোতে।সচল নৌকারূপী দেওনদী কিংবা মহাকালের বুকে।
উপন্যাসে চরিত্রগুলির সংলাপ মূল শ্রীহট্টের মানুষের বুকের ভাষা। উপন্যাসের অন্যতম মুখ্য চরিত্র অবন্তী,পাপুর মা,কমলা,লাউগোসাই ।চরিত্রগুলোর সংলাপ অসম্ভব জীবন্ত।পাঠকের বুক স্পর্শ করে।এই উপন্যাসে লোকজ পূজাপার্বন ও লোকসংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা অন্ধ্ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদী সংস্থার সদস্যরা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান মনস্কতা প্রচার ও প্রসার করতে চায়।যুক্তিবাদী সংস্থার অন্যতম সদস্য অবন্তীর সংলাপ যখন পাঠক শুনে মনে হয় এটাই সঠিক। আবার যখন কুসংসংস্কারে আচ্ছন্ন রাণীবালা,পরিমল, সুধা,বিমল মিরা--প্রমুখের সংলাপ শুনে মনে হয় এটাই সঠিক।এমনই মাটির কথা লেখিকা তুলে এনেছেন চরিত্র গুলোর মাধ্যমে।পাঠক-পাত্রপাত্রীর সংলাপ, প্রেক্ষাপট ও প্রকৃতির রূপচিত্র অঙ্কনে লেখিকার মুন্সিয়ানার কাছে নতজানু হতে বাধ্য।।শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যেতে যেতে মনে হয়,একটি খাস শ্রীহট্টীয় বৃহৎ ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থান ও বসবাস করছেন দীর্ঘদিন ধরে পাঠক।পাঠক অবলীলায় মিশে যায় শ্রীহট্টীয় লোকসংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতির জলে।এ থেকে বেরোতে পারে না। অনিরুদ্ধ ও অবন্তীর ভালবাসা বিয়োগান্তক।কল্লোল ও উষার ভালোবাসা সংসারের রূপ নিলেও সেই বিয়োগান্তক পরিণতির দিকেই টেনে নিয়ে যায় পাঠককে।পাঠকেরও এ নিয়ে কোন প্রতিবাদ থাকে না। উপন্যাসের শেষে লাউগোসাইকেও যেন মনে হয়, সেও মহাকালের দ্যোতক।অবন্তী যতই মনে প্রাণে বিজ্ঞান মনস্ক হোক না কমলা যতই ঘরের স্বপ্ন দেখুক না কেন পরিশেষে তাকেও সেই মহাকালরূপী নদী ও লাউগোসাইর বাউলপ্রেমের অসিমান্তিক আলোআঁধারিতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয় মহাকালরূপী অসীমের কাছেই।জীবন যে নদীর ভাঙাগড়ার মতোই নিত্য-অনিত্য এক নাট্যশালা- এই চরম পরম শাশ্বত সত্যের বা সেই অসীম বা মহাকালের কাছেই সে মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়।
পাপুর মা'র সাধুর কাছে আত্মসমর্পণ ও তার মনসাসিদ্ধারূপীজীবন,যা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ,এ সমাজদেহে অনাচার ও অত্যাচারের প্রতীক।যেমন দেওপারের মানুষও নদীর শরীরে অত্যাচার করে,যার পরিণতি পাপুর মার শেষ জীবন।আবার দেওপারের মানুষের কাছে নদীর রুষ্টরূপ- বন্যা ও ভাসানের জল।দেওনদী যেমন ধ্বংসকারি তেমন রক্ষাকারী,নির্মোহ ও উদাসীন।
নদী যে নর-নারীর কাছে কি, কোথায় তার শেকড়,পণের জন্য বলিপ্রদত্ত মেয়েহারা পিতা সীতাংশ,নদীর জলে পুত্রসন্তান খোয়ানো মীরা,প্রেমিকা হারানো কল্লোল,বিশ্বাস ঘাতকতার অনলে দগ্ধ ঊষার নদীজলের সাথে প্রলাপ ও নদীজলে পাপুর মা'র জীবনের পরিণতি না দেখলে উপলব্ধি করা যায় না,নদী কি!মা-মনসার সাপগুলি যেন মহাকালের অনুচর বা ভৈরব।এরাই যেন লোকজ জীবনের নিয়ন্ত্রক ।
উপন্যাসের শুরু হয়েছে দেওনদীর একটি প্রচলিত উপকথা দিয়ে শেষ হয়েছে দেওনদীর প্রাচীন গর্বিত ইতিহাস টেনে এনে অবন্তী,লাউগোঁসাই ও কমলার অসীমের ক্ষমতার উপলব্ধিতে।পাপুর মা তথা মেকি মা-মনসাসিদ্ধার অন্তিম পরিণতি টেনে দেওয়ের জলে ভাসানের প্রেক্ষাপটে।
অবন্তী দেওনদী নিয়ে প্রোজেক্ট করতে চেয়েছিল।নদীর শরীরে মানুষের অনাচার অত্যাচার প্রতিরোধকল্পে মানুষকে সচেতন করতে চেয়েছিল। প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের অসম্ভব লোভের বিরুদ্ধাচরণ করা ও নদীমাতৃক সম্পদকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করাই ছিল তার উদ্দেশ্য।যার ফলসরূপ মানুষ বিজ্ঞান মনস্ক হবে,নদী ও প্রকৃতির উপর অত্যাচার থেকে মানুষ নিরস্ত হবে।মানুষের কার্যকারণ সম্পর্কিত জ্ঞান বিকশিত হবে।মানুষ সুসংস্কার মনস্ক হবে ,সমাজদেহ থেকে কুসংস্কার দূরীভূত হবে।অন্যতায় নদী তীরবর্তী মানুষ নদীর সংগ্রাহীরূপে অতিষ্ঠ হয়ে বিবিধ কুসংস্কারের নাগপাশে আবদ্ধ হবে।সে হবে শোষণের শিকার।এও উপন্যাসের একটি বার্তা।
উপন্যাসের ভাষা খুবই প্রাঞ্জল,প্রতিটি শব্দ মেপে বসানো। উপন্যাসিক মূলত কবি,এই কারণে প্রতিটি লাইন মেদহীন ও মৃত্তিকা জারিত।এ কবির পক্ষেই সম্ভব।পড়তে পড়তে মনে হয়েছে,উপন্যাসের শরীরও মেদবর্জিত যেন এক অষ্টাদশী পাহাড়ি চিকলি।সত্যি, উপন্যাসের উপসংহারে গিয়ে নতজানু হয়ে বলতেই হয়,,"জলের কোন রঙ হয় না। বর্ণহীন জলই পারে সমস্ত কালিমা ধুয়েমুছে হৃদয়কে নিষ্কলুষ করতে।নদীই সে আয়না-যার জলে প্রতিবিম্বিত হয় --সমস্ত পাপ-পূণ্য--আশা-আকুতি।নদীই পারে সমুদ্রে লীন হতে।নদীই পারে দিতে ---অসীমের সন্ধান।সত্যিই তো ক্যামেরায় ছবি ধরা পড়ে ,ধরা পড়ে না জলের মতো--সমস্ত পাপ-পূণ্য--আশা-আকুতি।নদীই পারে দিতে সমুদ্রে লীন হয়ে --অসীমের সন্ধান।কিন্তু উপন্যাসিক পদ্মশ্রী মজুমদার এখানে মানুষের জীবন ও সময়ের বহমান কালের কথা বলতে চেয়েছেন।বলতে চেয়েছেন এক চিরন্তন বোধ ও ভাবনার কথা।আমি তার উপন্যাসিক ও কাব্যজীবনের প্রগতি কামনা করি।
দেওনদীর জল
প্রকাশক:স্রোত প্রকাশনা
প্রচ্ছদ -গৌরব ধর
মূল্য -২০০/
0 Comments