গ্রন্থ আলোচনাকবি সম্পা বৈদ্যের কাব্যগ্রন্থ 'প্রতিবিম্ব'হারাধন বৈরাগী
গ্রন্থ আলোচনা
কবি সম্পা বৈদ্যের কাব্যগ্রন্থ 'প্রতিবিম্ব'
হারাধন বৈরাগী
মানুষের ভেতরে বাস করে আরেক মানুষ।তার বাইরের রূপটি আমরা দেখি,ভেতরের রূপটি দেখি না।আর ভেতরের মানুষটিকে আড়াল করেই আমরা সর্বদা নিজেকে মেলে ধরি।কবি সম্পা বৈদ্য আমাদের ভেতরের, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত কিংবা আটপৌড়ে নারীর অন্তর বেদনাই বুঝি বিনির্মাণ করেছেন এই কাব্যগ্রন্থে।নারীর ভেতরঘর ও বাহিরঘরের মধ্যে নিয়ত ঘটে চলা মিথস্ক্রিয়াই বুঝি কবিতাগুলির অন্তর।নারীর সদাসেবাময়ী গৃহিনী রূপের আড়ালে যে অন্তরদহন,যা বাইরে থেকে দেখা যায় না কিংবা অবহেলা ভরে আমরা এড়িয়ে চলি তা-ই যেন কবি পরতে পরতে মেলে ধরেছেন পাঠকের কাছে।
নারী সংসারী হয়েও একাকিত্বের অন্তর্লীন বেদনায় সর্বদা ক্ষতবিক্ষত হয়,তার মাঝেও যেন পাওয়া না পাওয়ার এক অদৃশ্য উচাটন ক্রিয়াশীল। তার অন্তরলোকে পূরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতি নিয়ত এক অভিমান যা দ্রোহ প্রেম ও পয়ারে নিঃসঙ্গ একতারার মতো বাজে।যেমন-
"ঐ মেয়েটি জানালা ধারে,/শুধুই বারোমাস/---
গাইছে তার জীবন গান/---নিরালায় একটি কোনে,/--একতারার একটি তারে।"
নারীপুরুষ বাইরে সমকাজ করলেও, ঘরে এসে নারীর বাড়তি ঘরকন্নার চাপ।তাই দেখি কবির সখেদ উচ্চার- "মা আমার খেটে মরে।/সকাল হতে রাত।/বাবা তুমি অফিস গিয়ে/ক্লান্ত বারোমাস।/--হিসেব নিকেশ---/অফিস যাওয়া রান্না করা/ সব কেবল মায়ের কাঁধে,"-(ছেলের দাবী)।পরিবারে নারীপুরুষের ভোগ বিলাসের বৈষম্যে ,নারীর প্রতি নিয়ত অবহেলায় কবি রুধিরাক্ত হন,-"আমার চাওয়া দাবীগুলি/আর তোমার মিটিয়ে দেবার প্রতিস্রুতি,/
কেমন একটা গরমিল লেগেই আছে,/
--কৃতদাস হয়ে,/বেহিসাবি জীবন কাটাই।
বারোমাস একই ছাদের তলে।"(গরমিল)। "একজন নারী রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই যখন শুভ্রবস্ত্রে সংসারের সেবায় নিজেকে মেলে ধরে,আমরা ভুলে যাই তার মন খারাপ থাকতে পারে।তবু সে সংসারের সেবায় হাসি মেলে ধরে।এ যেন নারী জীবনের চিরায়ত একটা মুখোশ পড়া রূপ।তাই কবির সাবলীল উচ্চারণ-"রোজ সকালে স্নানটি সেরে/রাঙিয়ে দিস সাতটি রঙে!/--কতরঙের খেলা খেলিস!/মনটি থাকুক তোর যতই ভার! "আসলে সংসার যেন সং-সাজাই সার,আর সব অসার,বুঝেও নারী সং-সাজে,আর আশা-নিরাশার দরিয়ায় ভাসতে থাকে।এমন একটা দ্রোহহীন দ্রোহ ফুটে ওঠে -"মিছে সংসারের জ্বালা,/তবু নেই কোন অভিযোগ,/নেই কোন আশা!/মিছে বিবাহ বন্ধন/মিছে ছুটাছুটি"(সংসার)।আবার,-"যেমন কেউ শুনবে না তোর আর্তনাদ/পুরুষ ফুর্তি করে/নারী গর্ভে ধরে সেই পাপ।/তারপর মরে সে প্রতিনিয়ত/গাহে বাঁচার গান।/চাইলে কি সে মরতে পারে!/চাইলে শুধু রাত জেগে/চোখের জল ফেলতে পারে!/নারী হওয়ার এ কোন অপরাধ!"(আর্তনাদ)। এখানে নারীর যন্ত্রণা যেন স্যুচ্যেং টাক্কলের মতো গর-ধার কাটাকাটি!
পাঠককে ভাবায় যখন কবি বলেন"বেশ্যাকে তোমরা গালমন্দ করো?/তবে বোরখা পড়া মেয়েটার/কাপড় কেন ছিঁড়ো?---বেশ্যারা তো সওদা করে যৌনতার"(ফায়দা)। আবার,একজন উপার্জনশীল নারীর ছুটিতেও যেন ছুটি নেই।তাই চারদেয়ালের আবদ্ধ অন্ধকার থেকে সে মুক্তির আস্বাদন পেতে চায়,- "---ছুটি হলেই মন আমার ছুটে/গাঁয়ের ঐ পলাশ বনে।/--এখন আমার মনটা ভীষণ খারাপ।/আমি বাঁধা একটা ইট পাথরের ঘরে," (দীর্ঘ ছুটি)। কিংবা- "গাছগুলি ঠিক দাঁড়িয়ে আছে/একটি জায়গায়!/আর ডাকছে আমায় আয় আয়--" (সীমাহীন প্রতিক্ষা)।
নারী বলেই যেন তার চারপাশে ঘিরে থাকে ডগমা। আর এই অনুশাসন বা ডগমার বিরুদ্ধে কবির প্রতিবাদ-"গোগ্রাসে গিলতে থাকি সামনে রাখা ভাত,সব্জি,ডাল,পাঠার মাংস।/গোগ্রাসে গিলতে থাকি/সামনে রাখা কাঁচের গ্লাসের জল।/সামনে বসে থাকা বাবুরা মজা নিতে থাকে/--কেউ বা বলে মেয়ে মানুষ খাচ্ছে কেমনে, লোকে অলক্ষে বলবে।/আমি গোগ্রাসে-- গিলতে থাকি/আমার অপমান,রাগ,ঘৃণা--"(অলক্ষী)।আর তাই নারী কোন ফুরসত পেলেই যেন নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়,-"কতদিন অলস দুপুরে/আপনমনে ঢেউয়ের সাথে খেলে গেছি/পুকুর পাড়ের নুড়ি বালি পাথর দিয়ে।/--কেমন সব না বলা কথা/ভেবে গেছি আপনমনে"(অলস দুপুর)।নারী সংসারের সলতে হয়েও যেন পুরুষের হাতে বাঁধা-"কেবল অংকে কষা/হাত পা যেন বাঁধা।/জীবনের অংকের বোতাম যেন/তোমার কাছেই অযত্নে ছিল রাখা।"(রোবট জীবন)।একসময় অবহেলা অনাদরে নিজেকে আর মেলাতে পারে না নারী,তাই কবির আক্ষেপ-"আজকালের আমি আমার কাছেই/কেমন একটা অচেনা!/বয়ঃসন্ধি কালের পরে এমনভাবে আর/আয়না দেখা হয়নি।/সাদাকালো চুল,চোখের নিচে কালো ছাপ।"(প্রতিবিম্ব)।তবুও পুরুষের ভালোবাসার কাঙাল যেন নারী,-"শূন্যতার এই পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি/ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে।/আমার ছেঁড়া ঘুড়ি/তোমার ছাঁদে আটকে সে কবে থেকে! আমি আজও দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি।/না না ঘুড়ির জন্য না।/একবার আমার দিকে তাকাবে বলে।"(দাঁড়িয়ে কেন?)।কিংবা "আজও কেমন ধানের ক্ষেতে শিশির জমে,/আলতো করে ছোঁয়ে দেখো কেমন ছোঁয়া লাগে"(শিকল)। "সময় হার মানিয়ে দেয় সব।/জীবনের বাইরে হার জিতের কি দাম?"(জীবনের গল্প)। "সূর্য তোর প্রখর রোদে/পুড়াবি আমায় কত?/তোর আগুনে যতই জ্বলুক/আমার শুষ্ক ত্বক!/---অহঙ্কার করবি কত?"(প্রলয়)। "দেশলাইটা জ্বলছে জ্বলুক/পুড়ে হোক ছাই।/বারুদ না থাকলে/অহংকার চূর্ণ হবেই তার।"(দম্ভ)।এ যেন প্রেম পয়ার ও দ্রোহের ক্যারিকাটা শেষে ফের সেই চিরায়ত পুরুষাকারের কাছেই নারীর আত্মসমর্পণ!
সমগ্রকাব্য গ্রন্থের শরীরজুড়ে মিশে আছে সংসারী নারীর প্রেম-পয়ার-দ্রোহজলের নিঃসঙ্গ নিশ্বাস । ,যা পাঠককে রুধিরাক্ত করে।আর অলস অবকাশে ভেতরে ভেতরে যেন পাড় ভাঙে নদী।-"আজও কেমন দুপুর হলে/বটের ছায়া আমায় ডাকে।"
পরিশেষে বলব,কবিতায় শব্দ প্রয়োগ ও বাক্যের শরীর নির্মাণে কবিকে কোথাও কোথাও আরও একটু সচেতন হলে ভালো হত।কোন কোন কবিতা কিছুটা বিষয় ভিত্তিক ঠেকেছে।তবে পাঠক ভেদে তা নাও হতে পারে। দারুণ প্রচ্ছদ।কবির পরবর্তী কাব্যগ্রন্থের দিকে তাকিয়ে আছি।
প্রতিবিম্ব-সম্পা বৈদ্য
প্রচ্ছদ-এম আসলাম লিটন
স্রোত প্রকাশনা
মূল্য-১৩০ টাকা
0 Comments