গ্রন্থ আলোচনাঅনুপ ভট্টাচার্য্যের উপন্যাস চেনা মানুষ অচেনা গল্পঅমলকান্তি চন্দ
গ্রন্থ আলোচনা
অনুপ ভট্টাচার্য্যের উপন্যাস চেনা মানুষ অচেনা গল্প
অমলকান্তি চন্দ
"শালা ! এ জগতে দেখছি কেউ সুখে নেই!"
অনুপ ভট্টাচার্যের উপন্যাস "চেনা মানুষ অচেনা গল্প" পড়তে পড়তে বিহানের এই কথাগুলি বারবার করাঘাত করছিল,আর মনে হচ্ছিল আমারই চারপাশে যেন ঘুরঘুর করছে উপন্যাসের অসংখ্য ছায়াশরীর। চরিত্রগুলোর দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া নানান ঘটনাপ্রবাহের বাঁক নির্নায়ক মুহুর্তগুলো স্বার্থকরূপ নিয়েছে এই উপন্যাসে।প্রতিটি চরিত্র সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে জীবনকে পৌঁছে দিয়েছে চরম এক সত্যের দোরগোড়ায়।অধুনা বাংলাদেশের ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সিন্ধুকুমার গ্রাম থেকে দেশভাগের পর সেনগুপ্ত পরিবার প্রথমে ত্রিপুরার মেলাঘরে আশ্রয় নেয়।পরবর্তী সময় তারা চলে আসে আগরতলার জিবি এলাকায়।ঘটনা প্রবাহ মূলত আগরতলা শহরকেন্দ্রিক হলেও এর সাথে জুড়ে গেছে প্রান্তিক শহর ধর্মনগরের নামও।চেনা গণ্ডির ভেতর দাঁড়িয়ে উপন্যাসিক অচেনাঘটনার তাপমাত্রায় তেজপাতা সহযোগে যে ফোড়ন দিলেন,তা অপূর্ব রসাস্বাদন ঘটাল।
বাপ মারা যাওয়া বিহানের অভিভাবক বিনু কাকু সবসময় তার সাথে ছিলেন।সচ্ছল সংসারে সুখের মালা গাঁথতে গাঁথতে নিজের হাতে সাজিয়ে ছিলেন সেনগুপ্ত পরিবারকে।বিহান কর্কটরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতিমুহূর্তে বাবার মতো কাছে পেয়েছে দাদু বিজয়কৃষ্ণ সেনগুপ্তের পালিত সন্তানকে।রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও আত্মিক বন্ধনও যে সুদৃঢ় হয় এমন চরিত্র রূপায়নে লেখক সিদ্ধহস্ত বুঝা যায় । পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থায় অবসর প্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী বিহানের মা বিনতা করসেনগুপ্ত নিজেদের বিশাল পারিবারিক ব্যাবসা বিনয় মজুমদারকে নিয়ে সামলে গেছেন।একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে জীবনের তাগিদে সংসারের সর্বময় কত্রী হয়ে উঠার গল্প, সমাজে নারী পুরুষের ভেদাভেদকে তর্জনী দেখিয়ে শাসিয়ে গেল।জীবন আন্দোলিত হল সময়ের তাগিদে।
এই উপন্যাসে লেখক সময়কে দারুণ ভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছেন।আগরতলা শহরের আশেপাশের যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিহানকে অসম্ভব কাছে টানতো,আজ সেই সবুজ ধানক্ষেত আর নেই।বড় বড় দালান বাড়িগুলো আকাশের দিকে উঁকি দিচ্ছে।বিনু কাকুর বৌ রাণিকাকি নিঃসন্তান হওয়া সত্ত্বেও মেলাঘরে একাই একটি অনাথ আশ্রমে শিশুদের দেখভাল করতেন।বিনয় মজুমদার এই আশ্রমের জন্য নিজের উপার্জনের অধিকাংশ অর্থ ব্যয় করতেন। উপন্যাসিক তাঁর সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যে দিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার দারুণ উদাহরণ রেখেছেন।সময় চলতে থাকে। জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো কখনো কখনো দীর্ঘশ্বাসের মোড়কে আবদ্ধ থাকতে থাকতে কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠে।সময়টা গলা টিপে দেওয়ার জন্য দানবমূর্তি ধারণ করে।তার মধ্যে থেকেই বেরিয়ে আসে সমাধান সূত্র।
এই উপন্যাসের নায়ক বিহানের উদারতার পরিচয় পাওয়া যায় তাদের বাড়ির মালি রতন সাহাকে যথাসাধ্য তার সাহায্য করা থেকে ।তার ছোটবেলার বন্ধু অনির্বাণ রামঠাকুর কলেজের ফিজিক্সের ছাত্র।সে নিজেও এম বি বি কলেজে কমার্স নিয়ে পড়াশুনা করত। মফঃস্বল শহর ধর্মনগরের মেয়ে সুমি উইমেন্স কলেজে পড়াশুনার জন্য আগরতলা শহরে আসে।বন্ধু অনির্বাণের সহযোগিতায় প্রথমে সুমির গাওয়া একটি গানের ক্যাসেটে শুনে বিহান তার প্রেমে পড়ে যায়।এই উপন্যাসের নায়িকা সুমি চরিত্রটি খুব সহজ সরল একটা গান জানা পাখি।যার গান শুনে বিহান হারিয়ে যেত কোন এক কল্পনার জগতে।একটা ঘোরের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত সময় কেমন করে আত্মস্থ করতে হয় লেখক এই সময়ের দাবীকে দারুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।সমাজে চলতে গেলে অনেক পাশ্বচরিত্র সফলতার মাপকাঠিতে বিচার্য তা বন্ধু অনির্বাণ আর বিহানের মাসতুতো বোন অনন্যা এর উদাহরণ।বিহানের অসুস্থতার কথা শুনেও সুমি যে ধৈর্য্যর পরীক্ষা দিল তা উপন্যাসের সার্থকতা এনে দিয়েছে।
মা আর বিনুকাকুর রাতে বাড়িতে আসা অব্দি বিহান রতন সাহার সঙ্গে সময় কাটাতো। কোন কোন দিন নেশায় ডুবতে ডুবতে ছুটে যেত রতন সাহার ফেলে আসা জীবনের সিঁড়ি নামতে।সত্যেন সাহার জীবনপ্রদীপনার্সিংহোমের সামনে রেস্টুরেন্ট খোলার ইচ্ছেটা আজও বুকে চেপে আছে রতন।রতন বার বার ছুটে গিয়েছিল তাঁর কাছে।বিকৃতজীবন দেখার প্রথম উপলদ্ধি তার,স্বামীহারা মল্লিকাকে দেখে।দোকানে কর্মচারী খেটে খেটে রতনের জীবনটা কেমন কঠিন হয়ে উঠেছিল।কিছু আশা আঙ্খকাকে জলাঞ্জলি দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াইতো জীবন।একটা দুঃস্বপ্নের ভেতর সময় কেমন করে অস্থির হয়ে উঠে,দু'চোখ ভরে আনন্দ আস্বাদনের কি নিদারুন পিপাসা ,তা রতনকে না দেখলে অপূর্ণ থেকে যায়।
"-আটটায়,ক্যান?দশটায় তো আপিস খুলে।"
এই উপন্যাসে রিক্সাচালক পরান কর্মকারের উক্তিটি লম্পট সময়কে দারুণ ভাবে ইঙ্গিত করে।পরান কর্মকারকে ঘর,জবকার্ড পাইয়ে দেওয়ার অজুহাতে পঞ্চায়েতের নতুন প্রধান পরানের বন্ধু নিবারণ তার বৌকে পাঠাতে বলে।এই যে অস্থির সময়ের আকুতি তাতে সাড়া দেয় বিহানদের রান্নার মাসি মালতি।ক্ষুধা আর অভাবে জর্জরিত পরানের কাছে আর কোনো বিকল্প পথ নেই। নিবারণ প্রতিদিন রাতে মদ নিয়ে আসত পরানের জন্য। মদের নেশায় টলতে টলতে মদের গ্লাসে রক্ত দেখতে পেতো সে।তার কখনো ইচ্ছে হত পারলে নিবারণের মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করে দিতে।কখনও মেঝের উপর ঘুমিয়ে পড়ত সে।পরাণ জিবি হাসপাতালে ভর্তি হয়।মালতি সেই রাতে নিবারণের কাছ থেকে একশ টাকা চেয়ে নেয় স্বামীর ঔষধ কিনবে বলে।
এই উপন্যাসের লেখক অনুপ ভট্টাচার্য আগরতলা কেন্দ্রিক আঞ্চলিক ভাষার সংলাপ গুলো অতি বিচক্ষণতার সহিত রঘুর মা কিংবা জিতু ড্রাইভারদের মুখে মুখে উচ্চারণ করিয়েছেন।একটা সামাজিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে দিয়ে তর তর করে এগিয়ে গেছে উপন্যাসটি। কোন জায়গায় হোঁচট খেতে হয়নি কখনো।প্রতিটি প্রেম চিরন্তন সত্য। ক্ষুধার তাড়না মানুষকে কখনো কখনো পশুতে পরিণত করে।এই দিক থেকে সমাজ সচেতনতার বিশেষ ইঙ্গিতবাহী এই উপন্যাসটি।
চেনা মানুষ অচেনা গল্প
স্রোত প্রকাশনা
প্রচ্ছদ-প্রশান্ত সরকার
মূল্য-১৫০ টাকা
0 Comments