দামিনী এবং অন্যান্য গল্প:একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া গোবিন্দ ধর
দামিনী এবং অন্যান্য গল্প:একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া
গোবিন্দ ধর
কেউ কেউ তাঁকে "আত্মঘাতী লেখক" বলে চিহ্নায়িত করেছেন।তাঁর ভাষায়:"সমাজে একেবারে জলজ্যান্ত যে অমানবিকতা রয়েছে -বিশেষত নারীর প্রশ্নে,কীভাবে অনেকগুলো জাঁতাকল তৈরী রয়েছে তাকে পিষ্ট করার জন্য- সেটাই স্পষ্টভাবে বলে যেতে চাই।আমি কল্পনায় মন-কলা খাই না।আমার একান্ত ইচ্ছা, মেয়েরা তাদের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদ করুক, কথা বলতে শিখুক,সোনার বেড়ি-লোহার বেড়ি ছিঁড়ে এসে পথে নামুক।" এখানেই আদিমা তাঁর গল্পের মূল সুর ঠিক করে দেন।
আদিমা মজুমদারের পিতা আদনমিয়া মজুমদার, মাতা মউরুন নেছা।চার ভাই।চার বোন।তাঁর বাবা মায়ের পঞ্চম সন্তান তিনি।কোন এক দুর্যোগের সময় ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ সালে জন্ম তাঁর।শিক্ষা স্নাতক।পেশা নার্সিং।সহজ সরল ভাবে মোক্ষম কথাটি গল্পে বলে দিতে পটু।
ইতিমধ্যে তাঁর চারটি গল্প সংকলন পাঠকের নিকট তাঁকে আবিস্কারের মাধ্যম হিসেবে পাওয়া যায়।
সংকলনগুলো:
ক)সুইসাইড নোট ও অন্যান্য গল্প প্রকাশকাল-অক্টোবর:২০১৬
খ)আমি সেই মেয়ে ও অন্যান্য গল্প- প্রকাশকাল-অক্টোবর:২০১৬
গ)ভায়া বিবাহ প্রকাশকাল-ডিসেম্বর:২০১৭
ঘ)দামিনী এবং অন্যান্য গল্প প্রকাশকাল-অক্টোবর:২০১৮
আমার আলোচ্য এই চতুর্থ গল্প সংকলন:দামিনী এবং অন্যান্য গল্প।
গল্প গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর প্রিয়গ্রাম ইছারপার-কে।
আদিমা গল্প বুনেন বিবরণ ধর্মী নয় চরিত্রের ভাষ্যে।তাঁর গল্পে অযথা বাকসর্বস্যতাও নয়।অন্য রকম বাচনভঙ্গি।
দামিনী এবং অন্যান্য গল্প সংকলের প্রায় প্রতিটি গল্পই সমাজ সচেতন আদিমার কলম থেকে চাবুক মেরে অন্ধকারকে উন্মোচনের আলোকরেখা।
আদিমার বয়স হলেও তিনি যেমন আড্ডাপ্রিয় প্রাণোচ্ছল তেমনি তাঁর গল্পগুলোও তরতর করে এগিয়ে যায় পাঠকের মনোজগতে এক ভালো লাগা আবেশ জাগিয়ে।
আদিমা ট্রেড ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থাকায় শ্রমজীবী মানুষের সাথে তিনি কাজ করেন।তিনি নার্সিং পেশায় আসার পরেও বিভিন্ন দাবীদাওয়া বিষয়ক লড়াই সংগ্রামে নিজেকে সব সময় নিয়োজিত রেখেছেন।এতে তাঁর গল্প বলায় এই সকল লড়াই সংগ্রাম ধরা পড়ে অকপটে।
তাঁর কলম সব সময় লড়াকু মানুষের অধিকার আদায়ে সৈনিক হিসেবে ব্যবহৃত।সাধারণ মানুষ ও খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি অন্যায় অবিচারের তীব্র প্রতিবাদ তাও সাদামাটা নয় একদম চাঁচাছোলা।
আদিমা এখনো লেখেন।বারবার ছিঁড়েন।বারবার সম্পাদনা করেন।হয়তো একজন লেখকই সুদক্ষ সম্পাদক।আত্মসম্পাদক যার যেমন দক্ষ তিনিই প্রকৃত হয়ে উঠায় সঠিক দিশা পান।আদিমার গল্প সেজন্য সহজ সরল হলেও গল্প বলার কৌশলে তিনি একজন গল্পকার হয়ে উঠলেন।তিনি এই ভূবনপাহাড়ের পাদদেশে ইছারপার গ্রামের বাসিন্দা হয়েও সারা উত্তর পূর্বাঞ্চলেরই একজন সুগাল্পিক।
তাঁর প্রথম গল্প ছাপা হয় "কলম" পত্রিকায়,কলকাতায়।"শুচি করো মন"।আদিমা কবিতাও লেখেন।তাঁর প্রথম কবিতা"উপলব্ধি "।তিনি কবিতার পাশাপাশি তাঁর গল্পের বুননেও এনেছেন বহুমুখিনতা।
আলোচ্য সংকলনের গল্পক্রম:
ক)আমাদের স্বপ্ন
খ)হরে কৃষ্ণ হরে রাম
গ)ক্ষুধার্ত প্রেম এবং সুবর্ণজয়ন্তী
ঘ)আসামের ঈদ
ঙ)সেই মেয়ে
চ)বাঁকা চাঁদ
ছ)খোকনের ইচ্ছা
জ)পাখির বাসা
ঞ)অধ্যাপক নিবাস
ট)ভাবি
ঠ)লালসুতো নীলসুতো
ঢ)প্যারাডাইস লস্ট
ড)জীবন্ত হাসপাতাল
ণ)পরিণয়
ত)দামিনী
তাঁর গল্পগুলো এক একটি "জীবন্ত হাসপাতাল" ই।এই গল্পে এই সময়ের চিকিৎসা বিষয়ক চালচিত্র ধরা পড়েছে।সমাজে হিন্দু মুসলিম সমস্যা উঠে এসেছে "হরে কৃষ্ণ হরে রাম" গল্পের পরতে পরতে।"পাখির বাসা"গল্পে মেয়ের ঘর পাখির বাসার মতোই ভাঙ্গে এমনই আদিমার ভাবনার সাথে আমাদের পরিবারগুলোতে মেয়েদের অবস্থান। কারণে-অকারণে মেয়েদর ঘর ভাঙ্গার বিষয়কে চিত্রায়ন করেছেন গল্পে।"অসাম্যের ঈদ""ভাবি" প্রায় সব গল্পেই উঠে এসেছে আজকের সমাজের অন্ধ কুসংস্কারে দগ্ধ মানবীদের প্রাত্যহিক জীবনের দহন।
"দুলাভাইয়ের পায়ের নীচে বেহেশত!
আমি কিছুই করি না-
যেখানে বসে মেয়েরা আড্ডা দেয়,
কথা বলে,কবিতা লেখে,ছবি আঁকে
আমি সেখানে চুপি চুপি যাই।
-তাঁর একটি কবিতার পঙক্তি।
এক তীব্র শ্লেষ তাঁর কবিতায়।সমাজের গভীরে লুকানো ক্ষতগুলো কবিতার মতই ধরা দেয় তাঁর গল্পেও।
এই সংকলনের নামগল্প "দামিনী"। দামিনীর উপর ঘটে যাওয়া ধর্ষনের বর্ণনার পাশাপাশি আত্মকথন ঢং-এ লেখা এই গল্পে সময় এগুলোও সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের নারীদের উপর ঘটে থাকা ঘটনার চকমান দৃশ্যেরই চিত্রায়ন " দামিনী"কে বলে আদিমা সমাজকেই বলে দিলেন এক তীব্র সংকটের গল্প।
তাঁর গল্পের যাদুবয়ান চারপাশের অতিপরিচিত ঘটনাপ্রবাহগুলো আবার পুনঃপাঠ হলেও খুবই সময়োপযোগী।সমসাময়িক সমাজের চলমান সময়েরই বয়ান হলেও শুধু বয়ান যে নয় তাঁর প্রতিটি গল্পই সুখপাঠ্য।গল্পগুলো পড়লে পাঠক সময়ের যন্ত্রনাগুলো নিজের চোখেই দেখতে পান।এখানেই আদিমা মজুমদারের সাফল্যের চাবিকাঠি।
আদিমা পঠিত হলে উত্তর পূর্বাঞ্চলের গল্পবিশ্বের মুল সুরই পঠিত হবে এ আমার বিশ্বাস।শামিমের প্রচ্ছদ আমাকে আকৃষ্ট করলো।
*দামিনা এবং অন্যান্য গল্প
প্রকাশকাল:অক্টোবর -২০১৮
প্রচ্ছদ :শামীম আহমেদ
প্রকাশক:জয়ীশা প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিকেশন
মূল্য:৮০:০০টাকা।
0 Comments