শ্রেষ্ঠ কবিতা : বিকাশ সরকার
স্রোত প্রকাশনা 
মূল্য:২০০

পাঠ প্রতিক্রিয়া : জ্যোতির্ময় বিশ্বাস

একজন কবির 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' পাঠের সবচেয়ে মহৎ আদায়টি হল, কবিকে সামগ্রিকভাবে ধরা যায়। কারণ, কবির যাত্রাপথ, চিন্তাভাবনা, অন্বেষণ, লিখন-রাজনীতি সকলকিছু তার ধারাবাহিকতা ও ছেদসহ ওই বইটিতে হাজির থাকে। সম্প্রতি বিকাশ সরকারের 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' (স্রোত, ২০১৫) পাঠ করে আমার এই ধারণা। কেননা বইটিতে যেমন 'কনিষ্কের মাথা'-র বিকাশ সরকারকে পাই, তেমনি পাই 'গয়েরকাটাসমগ্র' কিংবা 'অনন্তছুতোর', 'আনন্দদোতারা'-র বিকাশ সরকারকে। অনেকগুলো কবিতা আগে পড়া থাকলেও যেহেতু প্রত্যেক পরবর্তী পাঠ পাঠককে নতুনতর পাঠ-অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করাতে পারে, আমার পাঠেও তা-ই হয়েছে কিছুক্ষেত্রে।

এই বইটার শুরুতেই রয়েছে যথাক্রমে 'বাবা' ও 'মা' কবিতাদুটি। 'মা' কবিতায় রয়েছে এই নিবিড় প্রার্থনা : 'খিদে, শ্রম, হাঁজা...কয়লার পৃথিবী থেকে দূরে/ মা, তুমি আমাকে দ্রুত পৌঁছে দাও’। তারপর, সারাটা বই কবির সেই বিষাদমুখর যাত্রাপথেরই গান শুনিয়ে যায়। যেন, তাঁর 'প্রত্নগ্রিক' বাবা আর আখার ধোঁয়ায় প্রায়ান্ধ স্নেহময়ী মা 'স্নেহকুপি' জ্বেলে বিকাশকে সেই কাঙ্খিত দূরের পথে কিছুটা এগিয়ে দিতে চান। সর্বগ্রাসী ক্ষুধা, দারিদ্র, অপমানগুলি থেকে, প্রেম ও মৃত্যুর সুউচ্চ বেদনা থেকে―যে অমোঘ দূরের দিকে বিকাশের অন্তহীন যাত্রা। যাত্রাপথে কুপি থেকে আলো এসে পড়ে। আলো পড়ে একজন বিকাশের অনালোকিত ভুবনে। যে ভুবনে ডুয়ার্সের এই অরণ্যতাড়িত কবি পাঠককে আমন্ত্রণ জানান এইভাবে: 'জমাটি আড্ডা হবে সারারাত্তির, আখায় চাপিয়ে দেবো জাউ/ মারুয়ার মদ হবে, বাজবে মাদল, কুয়াশার নাচ দেবো ফাউ।' মন্ত্রমুগ্ধের মতো পাঠককে সেই ডাকে সাড়া দিতে হয়। দেখা যায় সেখানে রয়েছে একটি ধনেশ পাখি যে ডানা ঝাপটায় আর তার ডানা থেকে ঊষ ঝরে পড়ে। তাতে অকালমৃতা লক্ষ্মীর 'একরত্তি ঘর ভিজে যায়।' সেখানে রেতিনদীর আলোয় কবি স্পর্শ করেন একজন সপ্তদশীর পেরেকবিদ্ধ পা আর বলেন : 'এটাই শেষ স্পর্শ, কচি, আর কোনোদিন দেখা হবে না।' তারপরেই, ওই বিষাদ লেখার পরেই ভরসা জাগায় এমন লাইন : 'কখনও দেখিনি মারী ও মড়কে দীর্ণ পৃথিবীটি এত সুন্দর।' আসলে বিকাশ সরকারের প্রতিটি বাক্যই যেন পিকাসোর একেকটি রেখা। কবিতার অংশ হয়েও উজ্জ্বল; একা একটা বাক্য হয়েও উজ্জ্বল। 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' পড়তে পড়তে 'মায়ের পাশে শুয়ে বাবা রাতে করেন ভাতবন্দনা' অথবা 'তুমি কিংবা আমি থাকব না কেউই, এতসব আয়োজন তারই'– এই বাক্যগুলো তাই আমাদের অনুভবের সঙ্গী হয়ে যায়।

[এই লেখাটি কিছুটা পুরোনো, এবং অপ্রকাশিত]