কাব্যগ্রন্থ "জল আয়নার আমি"

কবি সোমেন চক্রবর্তী

প্রচ্ছদ ---প্রশান্ত সরকার

স্রোত প্রকাশনা

আলোচনা:স্বপ্না নাথ

 কোনও এক সমালোচক বলেছিলেন--বিশ্লেষণের আর এক নাম শব্দ ব্যবচ্ছেদ।
তাতে আমরা  প্যাথলজি রিপোর্টের মতো ছন্দ পাবো,শব্দ পাবো,পাবো অলঙ্কার-চিত্রকল্প-অবয়ব সংস্থান,কিন্তু কবিতাকে পাবো না। অনেক তত্ত্ব জানতে পারবো,কিন্তু  তৎক্ষণের পাঠক মনের সঙ্গে কবিতাটির গূঢ়  সম্পর্কের গোপন রহস্যটিই ধরতে পারবো না।"

কথাটি একদম সত্য। কারণ কোনও কবিতাই সব পাঠককে একইভাবে নাড়া দেয় না,আবার একই কবিতা  এক এক অবস্থায় পাঠকের মনে এক এক রকম লাগে। কবিতা অনেক স্পন্দিত মূহূর্তকেও অনেক সময় নিস্পন্দিত করে তোলে,আবার নিস্পন্দিত মুহূর্তকে স্পন্দিত করে তোলে। কবিতার যাদুই এরকম।তাই বেশি কিছু না ভেবে কবিতার সঙ্গে  স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাওয়াটাই ঠিক

কবি সোমেন চক্রবর্তীকে পড়তে গিয়ে মনে হল কবি  যা দেখেছেন একেবারে স্বচ্ছন্দ দৃষ্টিতে দেখেছেন
"পুরানো চশমা ভেঙে গেলে নতুন নিয়ে আসি
মাধ্যম বদলে গেলেওদর্শক ও দৃশ্য বদলায় না"

"আমগাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে পরবর্তী ঋণ মকুবের আশায়"---একটা মৌনী গাছকে কত দক্ষতায় কবি  পাঠকের কাছে ব্যথিত মনোযোগী করে তোলেন।

"বুড়িগঙ্গার জল হাতে নিয়ে দেখো,কাঁদছে এখনো ঘসেটি বেগম"

"জোর করে থেকে যেতে চাই যদি
আমি কনিষ্ক হয়ে যাই বারংবার"--কবি খুব সুন্দর উপস্থাপনে ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত
 করে তোলেন।

"ঈশ্বর কিংবা  ঈশ্বরী  আমার খোঁজে কড়া নাড়লে
দরজা খুলে বলব--আমি নেই"

"আমি নিজেই,
সন্দেহের আঙুল তো  ঈশ্বরকেও দেখাই"----খুব আত্মপ্রত্যয়ী কবি যেন ঈশ্বরে বিশ্বাসী হয়েও কলম খুলে ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন।
"অভিমান বেড়ে গেলে--
শিবের জটা ছেড়ে মাটিতে বিলাপ করে গঙ্গা"----মানুষের দুর্দশা    কী নিদারুণ যন্ত্রণায় পাঠকের সামনে জীবন্ত করে তুলেছেন কবি এক ঐতিহ্যকে অনুসরণ করে।

"শকুনও  জানে---
ক্ষুধার কাছে সম্মোহিত হয়ে
ইন্দ্রজাল ছাড়াই শরীরের মাংস খুলে রাখে কৃষক"----বেশ সচেতন শিল্পীর পরিচয় পাওয়া গেছে  এরকম আরও 
অনেক পঙক্তিতে।

নিজেকে সক্রেটিস  ভেবে কবি যখন বলেন--"আত্মদ্রোহে হেরে গেলে-
অন্তিম পেয়ালা  নীল হয়ে ওঠে ভিতরের গুপ্ত কারাগারে"--- কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থে এরকম আরও কিছু পরিণত মননের ছাপ রয়েছে।

যখন কবি বলেন --"আমি হই কোনো এক প্রখ্যাত শিল্পী
 বাইরে ভায়োলিন বাজে
ইজেলের বুকে আঁকি ---মোনালিসার হাসি"---সৌন্দর্যমুগ্ধ একটা স্বপ্নময় মনের সন্ধান পেয়ে যাই কবির।

"কতটা আলোকবর্ষ হেঁটে গেলে ভোলা যায় অতীথ?
কতটা বদলালে ঋতু বদলায় মনের প্রতীত"---কিছু দ্বিধা,দ্বন্দ্ব,প্রশ্ন নিয়ে কবির নিজস্ব বিশ্বাসের ঐকান্তিকতায় কাব্যপথ পরিক্রমা যথেষ্ট আন্তরিক।

   কবিকে আর খোঁজাখুঁজি করতে হবে না।নিঃশব্দে আসেন নি  কবি সোমেন চক্রবর্তী। তাঁর কাব্যচর্চার অতন্দ্র সাধনা   বেশ  মনোহর।   আমি ব্যক্তিগতভাবে কবির এই সতেজ মনোভাবকে    সম্মানের সাথে অভ্যর্থনা জানাই।  সঙ্গে অভিনন্দন জানাচ্ছি স্রোত প্রকাশনাকে এই  মননশীল বইটি পাঠকের  কাছে  তুলে ধরার জন্য।