এলেবেলে ছেলেবেলা অলক দাশগুপ্ত স্রোত প্রকাশনা
এলেবেলে ছেলেবেলা
অলক দাশগুপ্ত
স্রোত প্রকাশনা
এক আপাত নিস্তরঙ্গ সময়। মফস্বলধর্মী গন্ধ গায়ে মেখে আটপৌরে রাজধানী আগরতলা। সদ্য শেষ হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিযুদ্ধ। বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নিয়েছে নতুন এক দেশ - বাংলাদেশ। আগরতলা - বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বাতাসে বারুদের গন্ধ, সাইরেনের কান্না, বাড়িতে বাড়িতে বাঙ্কার, রাস্তা মাড়িয়ে চলে যাওয়া রাশিয়ান ট্যাঙ্ক, আকাশ চিরে ন্যাট যুদ্ধবিমানের উড়ে যাওয়া, ইতিউতি শরণার্থীদের বিষণ্ণ হেঁটে চলার স্মৃতিগুলো তখনো টাটকা। শহর আবার তার চিরচেনা ঢিমেতালের জীবনে ফিরছে।
দুপাশের গাছের ছায়ায় ঢাকা শুনসান রাজপথ। কটা বেডফোর্ট ট্রাক, মুড়ির টিন বাস আর রিক্সার চলাচল। পাকা বাড়ির সংখ্যা খুব কম কিন্তু বাঁশের বেড়ায় ঘেরা প্রতিটি বাড়ির সামনে বাগান, বিকেলে ভেসে আসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে রবিগান। ঝোপের ঢাকা পুকুরের পাড়ে তীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে ডাহুকের দল। বাঁশবাগান থেকে রহস্যময় শব্দ ওঠে, শেয়ালের ভয়ার্ত স্বর আর অজানা পিশাচের ভয়। কুঞ্জবনে নাগকেশর গাছের নিচে পরী দেখে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিশোর।
টিমটিমে লাল ল্যাম্পপোস্টের বাতি, ঘন কুয়াশা, দূরের সংকীর্তনের আসর থেকে ভেসে আসা উদাসী বাঁশির সুর, অধিকাংশ বাড়িতে তখনো বিদ্যুৎ প্রবেশ করেনি। অধিকাংশ যৌথ পরিবার, রাগী রাগী মুখে হুঁকো টানা বৃদ্ধ কর্তা, হারিকেনের আলোয় চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করছে ছাত্র, সামনে বেত নাচানো মাস্টারমশাই। পাকের ঘরে কুপির আলো ধিকি ধিকি জ্বলছে কাঁপতে কাঁপতে, মানুষের ছায়াগুলো ভুতুড়ে দেখায়। পুকুরপাড়ে থোকায় থোকায় জোনাকি জ্বলে, ঝিঁঝির ঐক্যতান।
সেই অদ্ভুত অর্ধেক গ্রাম অর্ধেক শহর। লাঙ্গাভর্তি জুমের ফসল নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে আসা হাসিখুশি বৈনারি। সাইকেল চেপে রোগীর বাড়ি ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা করতে আসা মনু ডাক্তার। ইস্কুলের স্নেহপ্রবণ এবং মারকুটে শিক্ষক মশাই, ডানপিটে এবং লাজুক বন্ধুরা এবং আশ্চর্য টিফিন। প্রেমিকদের সাংকেতিক আদান-প্রদানের যন্ত্র কটকটি। পাড়ায় পাড়ায় ঝাড়পিট, মাস্তান, সিনেমা টিকিট ব্ল্যাকার আর রঙ্গ দারোগা। সিনেমা হলে পাঁচ বছরের পুরোনো 'টাটকা জনপ্রিয়' ছবি লাগা! উমাকান্ত মাঠে পদ্মজং ফুটবল টুর্নামেন্ট। কবিরাজি দোকানে বসে বিমল চৌধুরী লিখে চলেছেন দুরন্ত উপন্যাস। জিমন্যাস্ট মন্টু দেবনাথ আলোড়ন তুলেছেন দেশজুড়ে। ক্রিকেট মাঠে বাঘা ভৌমিকের আগুনে ডেলিভারি, মনাদার আম্পিয়ারিং। জোকারের পোশাক পরে ঘুঙুর বাজিয়ে চানাচুর বিক্রি করতে আসা সেই লোকটা। নেতাজি রং জন্মদিনের ট্যাবলো আর বিজয়া দশমীতে দুর্গার মিছিল। ক্ষয়াটে হকারকাকু এবং সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি ইন্দ্রজাল কমিকস। সোভিয়েত রঙচঙে দুর্ধর্ষ বইগুলো। শান্তিপাড়ার ডালপুরি, কাঁসারিপট্টির চপ, নির্মলা রেস্টুরেন্ট, গুজরাট হোটেলের দোসা ও নারকেল চাটনি।
বসন্তোৎসবের গান 'আজু মন্দ মন্দ বহত পবন'। পাড়ায় পাড়ায় বিজয়া সম্মেলন। সিপাহীজলায় পিকনিক। চিলড্রেনস পার্কে বাৎসরিক মেলা। আকাশকে চুমু খাওয়া নাগরদোলা, বন্দুক ছুঁড়ে বেলুন ফাটানো, নিরামিষ জুয়ার ঠেক।
সাইকেলের পরিত্যক্ত টায়ার বারি মেরে ছুটতে থাকা বালকের চোখে দেখা এক আশ্চর্য শহর। আপনার সেসব স্মৃতি, ভুলে যাওয়া চেনা চেনা ঠিক চেনা নয় শহরের কাছে, অতীতের কাছে ফিরে যাওয়ার চিরন্তন আর্জি। উজান বেয়ে নৌকা বাওয়ার কাহিনি। আমাদের শৈশব, কৌশোরকে একটু ছোঁয়া, কবেকার হারিয়ে ফেলা ফুলের সৌরভ মেশা এক ঝলক বাতাসকে আরো একবার চোখ বুজে বুকে টেনে নেওয়ার কাহিনি।
জিপসি বুড়ির জাদুকরী ত্রিশিরা কাঁচের গোলকের মতোই যে বইয়ের পাতায় পাতায় প্রতিবিম্বিত ফেলে আসা এক শহর, এক সংস্কৃতি এক যাপন, আমার- তোমার যৌথ ছেলেবেলা - বড়ো আদরের, বড়ো যত্নের 'এলেবেলে ছেলেবেলা'।
0 Comments