স্রোত
ত্রিপুরার সাহিত্যের পাঠ ও অন্যপাঠ
০৬:০৭:২০২৪

বিজন বোস এর আলোচনা 

গত ৬ই জুলাই বিকেল পাঁচটায় "ত্রিপুরার সাহিত্য পাঠ ও অন্যপাঠ" বিষয়ক আড্ডায় সমবেত হয়েছিলেন ত্রিপুরার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জানা চল্লিশেক আড্ডারু। আয়োজক স্রোত প্রকাশনা। আড্ডা বসেছিল আগরতলা মেলার মাঠ স্থিত ঘরানা পাবলিকেশনের নিজস্ব হলে। আগরতলায় আড্ডার ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করেন বিমল চক্রবর্তী ও অশোকানন্দ রায়বর্দ্ধন । ছিলাম বিকাশ সরকারের একটি বইয়ের উপর ছোট্ট আলোচনা নিয়ে। তাই এখন শেয়ার করছি আপনারদের জন্য।

    বিকাশ সরকার বাংলা সাহিত্যের বিশেষতঃ বাংলা কবিতা জগতে এক উল্লেখযোগ্য নাম,  উত্তর পূর্বের বাংলা সাহিত্যের আলোচনা বিকাশকে বাদ দিয়ে কোনভাবেই পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। কিন্তু গল্পকার হিসেবেও উনি কম যান না। উত্তর বঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চলের গায়েরকাটায় তার জন্ম , শৈশব যৌবনও কাটিয়েছেন এই অঞ্চলে। পরবর্তী সময়ে কর্মসূত্রে আসামে চলে যান। কবিতার মতো বিকাশের গল্পে এই দুই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন যাপন সুখদুঃখ হাসি কান্না প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। মূলত বিকাশ সরকারের লেখা গল্প সমগ্র ১ নিয়েই এই ছোট্ট আলোকপাত।

             মোট ১১টি  ছোট ছোট গল্প নিয়ে এই বই। পরাণ বন্ধুরে, মনসামঙ্গল, অন্তর্গত রক্তের ভিতরে, রান্না ঘরের জানালা, অক্টোবরের শেষ পাঁচদিন, নিহিত অন্ধকার, উমিয়ামের জন্ম, আলোকবর্ষ দূরে,জলদাপাড়ায় একদিন, আমার ভিতর যে জন আমি, এবং 'ওলটানো ফোটোগ্রাফ' ।
    
             আধুনিক বাংলা কথা সাহিত্যের বিবর্তন যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে দেখতে পাবো গত শতাব্দীর সাতের দশক থেকে বাংলা গল্প উপন্যাস বাঙালির নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের পাশাপাশি গ্রামীণ মানুষের বিভিন্ন লোকাচার, তপশিলী ও উপজাতীয় মানুষের জীবন গাঁথা, তাদের আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক সরলতা জটিলতাকেও অকপটে তুলে ধরেছেন কথা সাহিত্যিকরা। বিশেষতঃ ভগীরথ মিশ্র, সাধন চট্টোপাধ্যায়,কিন্নর রায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, অমর মিত্র , শ্যামল ভট্টাচার্য প্রমুখ নতুন যুগের কথাকারদের রচনায় আমরা তার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখতে পাই।

         সে যাইহোক, আমি বিকাশের গল্প সমগ্র ১(একের) একটি একটি গল্প ধরে ধরে ছোট আকারে আলোকপাতের মাধ্যমে এগোতে চাই।

            প্রথম গল্প পরাণ বন্ধুরে। এই গল্পে বিকাশ মূলতঃ বিশ্বায়ন পরবর্তী সময়ে ডুয়ার্স অঞ্চলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের জীবন যাপন পদ্ধতি কিভাবে বদলে গিয়েছে তার আভাস দিয়েছেন। জাতপাত পুরনো ধ্যান ধারণা ঝেড়ে ফেলে অর্থ কৌলিন্যকেই জীবনের উপজীব্য হিসাবে তুলে ধরেছেন। এই গল্পের নায়ক জমিদার রমানাথ আর মুসলিম বিধবা নারী নুরজাহানের গড়ে ওঠা সম্পর্ক তারই প্রতিফলন। 
         দ্বিতীয় গল্প মনসামঙ্গল পড়তে গিয়ে ফ্রানজ কাফ্কার 'মেটামরফোসিস'এর কথা মনে পড়ে গেল। রুদ্র আর আরতির দাম্পত্য সম্পর্ক, একমাত্র ছেলের সঙ্গে দূরত্ব, বোন বাবলির আত্মহত্যার পর সর্পিনীরূপে পুনঃ জন্ম এই সমস্ত বিষয়কে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পকার। এমনকি সর্পিনীরূপী বাবলি যেভাবে অল্প সময়ের মধ্যে রুদ্রের পরিবারের একজন হয়ে উঠেছিল এবং খুব দ্রুত শীতঘুমে চলে গিয়েছিল তাতে মনে হয়েছে গল্পকার  জাদুবাস্তবতায় সমৃদ্ধ না হলে এমন চয়ন সম্ভব নয়।

          তৃতীয় গল্প 'অন্তর্গত রক্তের ভিতরে' মূলত গল্পের নায়ক সুমন ,নায়িকা সীমা এবং অপাবৃতার পরকিয়ার ত্রিকোণ প্রেমকে নিয়ে গল্প এগিয়ে গেছে । তথাপি এই প্রেমকাহিনী থেকেও অত্যন্ত সুকৌশলে কমিউনিস্ট দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন একজন আদর্শবান রাজনৈতিক কর্মীর কাছে কতটা হতাশার তার চমৎকারভাবে গল্পের সহ নায়ক অভিতাভ মৈত্রের আত্মহননের প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের কাছে উপস্থাপন করেছেন। 

       পরবর্তী গল্পে যাওয়ার আগে বিকাশের গল্প সম্পর্কে আরেকটু বলে নিই। আসলে বিকাশের গল্পের আর এক আকর্ষণ হলো নাটকীয়তা। নাট্য রচনা দিয়ে তার লেখক জীবনের সূচনা হয়েছিল বলেই হয়তো তার গল্পগুলোতে সরলরৈখিক ঘটনা প্রবাহের বদলে দেখতে পাই নাটকীয় গতিবেগ , উত্থান পতন। জানালার ধারে গল্পটিতে গ্রামের নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে নিলয় ও রিনির প্রেমের মাঝখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নিলয়ের বেকারত্ব। বেশ কয়বছর অপেক্ষা করার পর একসময় রিনি নিলয়ের আশা ছেড়ে দূরে কোথাও নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। ইতিমধ্যে নিলয় ব্যাঙ্কে ভালো চাকরি পেয়ে গৌহাটিতে সরকারি একটি ফ্লাটে উঠেছে। এখানে জয়েন করে বছর দুই নিলয় রিনিকেই খুঁজে বেরিয়েছে। সে জানতো রিনি এ শহরেই আছে। হঠাৎ একদিন আবিস্কার করলো । নিজের ফ্ল্যাটের কিচেন থেকে জানালা দিয়ে তাকালে রাস্তার ওপারের ফ্লাটে কিচেনেই সময়ে সময়ে দেখতে পাচ্ছে রিনিকে। এই খবর নিলয় বোন সহ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে শেয়ার করে।  রিনির সঙ্গে দেখা করে রিনিকে আপন করে নেওয়ার জন্য সকলে তাড়া দিলেও নিলয় হুট করে সে পথে হাঁটেনি। সময়ে সময়ে রিনিকে জানালা দিয়ে দেখেই যেন নিলয়ের স্বস্তি। অবশেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে একদিন সেই ফ্ল্যাটে উঠতেই এক বয়স্ক লোকের সঙ্গে দেখা। কথায় কথায় জানতে পারে নিলয়ের ফ্লাট থেকে যে রুমটিতে রিনিকে দেখে সেটাই ভদ্রলোকের ঘর । ভদ্রলোকের সঙ্গে ভাব জমিয়ে উনার ঘরে গিয়ে জানতে পারেন ভদ্রলোক ও উনার তিন ছেলেই অবিবাহিত। নিলয় তখন বলে 'কোন কাজের মেয়ে আছে নিশ্চয় '। 
এর পরের কথোপকথনটা এরকম 'আরে না না, আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পর আজ পর্যন্ত কোন মহিলারই পদার্পণ ঘটেনি এই ফ্লাটে। বললাম তো রীতিমতো ‌স্ত্রী বর্জিত এক দীর্ঘ নাটকে অভিনয় করে চলেছি আমরা চার বাপব্যাটা।
'কিন্তু আমি যে রিনিকে ঠিক এই কিচেনেই দেখেছি।'।
ভদ্রলোক এবার মনে হয় বিরক্তই হলেন।ফের কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, মানে কী? আমার কিন্তু ওইসব বদ অভ্যেস নেই মশাই। ফ্লাটে মেয়ে ছেলে আমি আনি না। স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমার কোন নারী সংসর্গ হয়নি।আর ছেলেরাও কাউকে আনতে পারবে না, কেননা আমি সারাক্ষণ এই ফ্ল্যাটেই। অবসরের জীবন যেমন হয় আর কী...
এইরকম নাটকীয়ভাবে আরো কিছু এগিয়ে গল্পটি শেষ হয়েছে।
   
         'অক্টোবরের শেষ পাঁচদিন ' এই গল্পে গল্পকার প্রথম তিনদিন এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যাতে পড়ে একবারও মনে হয়নি নায়ক নায়িকা একজন অন্যজনকে একবারও বলেননি "আমি তোমাকে ভালবাসি" চতুর্থ দিন যখন বিশাল প্রেমপত্র লিখে গল্পের নায়িকা কচিকে দেবার জন্য পকেটে করে নিয়ে গিয়েও কচিকে চিঠিটা দিতে পারেনি। পরন্তূ চতুর্থ দিন একটি সিনেমা হলের কাছে দুজনে সাক্ষাৎ হলেও দুজনেই চলে যায় নিরিবিলি একটি বাগানের দিকে। ঘণ্টা দুয়েক আড্ডায় মজে ফেরার সময়ে কচি একটা চিরকুট নায়কের হাতে দিয়ে বলে আজ তোমার মতো আমিও কবিতা লিখেছি, এ আমার প্রথম কবিতা লেখা। বাড়িতে গিয়ে পড়ে আমাকে আগামীকাল তোমার মতামত জানাবে । চিঠি নিয়ে সে একটি চায়ের দোকানে বসে খুলে তাড়াতাড়ি চিঠিটা পড়ে, যার মর্মার্থ এরকম..." কচি লিখেছে-  সেই কবে থেকে তোমাকে ভালবাসি, কিন্তু বলতে পারি কই? এবার পণ করে এসেছিলাম, পূজোর ছুটি ফুরোবার আগেই, শান্তিনিকেতন যাওয়ার আগেই তোমাকে এই ভালোবাসার কথা জানিয়ে যাবো।পরশু দার্জিলিং মেলে চেপে চলে যাবো। মাঝখানে রইলো শুধু কাল।কালই আমি জানতে চাই তোমার মতটা কী। না না ঠিক মতও নয়, জানতে চাই তুমিও আমাকে ভালবাস। আমাকে তোমার ভালো বাসতেই হবে। আমি' না' শুনতে চাই না। আমাকে ভালো না বেসে তোমার উপায় নেই।কাল বিকেলে আমি তোমার মুখ থেকে শুনবো 'কচি' আমিও তোমাকে ভালবাসি ' । এটাই লাস্ট এণ্ড ফাইনাল।

         পরদিন কচিকে ভালোবাসার কথা জানানোর জন্য কচির বাড়িতে গিয়ে কচির বাবার কাছে শুনে ভোরেই ভাই নীলের সঙ্গে কচি বাসে চেপে শান্তিনিকেতনের উদ্দেশ্য রওনা হয়ে গেছে। ৫ তারিখের আগে ট্রেনে রিজার্ভেশন পায়নি বলেই বাসে আগেই রওয়ানা হতে হয়েছে। একরাশ হতাশা নিয়ে সে কচিদের বাড়ির দোতলা থেকে নেমে এলো। এখানেও গল্প বলার ক্ষেত্রে গল্পকার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।

      একজন সাচ্চা কমিউনিস্ট নিজের আদর্শ রক্ষার জন্য প্রাণ পর্যন্ত বাজি ধরতে পারেন, সমাজ বদলানোর স্বপ্ন দেখান মানুষকে।  নিজের ছেলেকেও বানিয়েছেন সাচ্চা কমিউনিস্ট। কিন্তু অবলা স্ত্রীর সংস্কার ও বিশ্বাসের কাছে হোঁচট খেতে হয় শেষ পর্যন্ত। এখানে  স্থান কাল আঙ্গিক গল্প বলার ধরণ আলাদা হলেও একটা জায়গায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজর্ষি উপন্যাসের সঙ্গে একটু মিল খুঁজে পাই। গোবিন্দ মাণিক্য যেমনভাবে অধর্ম ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কদম উঠাতে গিয়ে অর্থাৎ ভুবনেশ্বরী মন্দিরে পশুবলি নিষিদ্ধ করতে গিয়ে রঘুপতির পরেই যার কাছ থেকে সবচেয়ে বড় বাঁধার সন্মুখীন হন তিনি হচ্ছেন গৌবিন্দ মাণিক্যের স্ত্রী গুণবতী। নিজের ঘর থেকে যে বিরোধীতা তা ডিঙানো কতটা কঠিন তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি রাজর্ষি উপন্যাসে । এখানে বিকাশের 'নিহিত অন্ধকার ' গল্পের নায়িকা তৃণার বিয়ে ঠিক হয়েছিল চা বাগানের ম্যানেজার রাজীব ভট্টাচার্য্যের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের মাত্র তিনদিন আগে কে এল ও জঙ্গিগোষ্ঠীর হাতে নিহত হন রাজীব। যে শাম্বের বাবার মৃত্যুর পর তৃণার বাবা তর্পণ ভট্টাচার্য্যের দয়ায় শাম্বের মায়ের চাকুরী, পরবর্তী সময়ে শাম্বের মাকে জেলা পরিষদে সদস্য করা থেকে শাম্বকে এস এফ আইয়ের নেতা হিসেবে তুলে আনার ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছিল তর্পণ ভট্টাচার্য্য , যে বাড়িতে শাম্বের ছিল অবাধ যাতায়াত, তৃণার ভাই সাচ্চা কমিউনিস্ট তুষারের বোসম ফ্রেণ্ড শাম্ব এমনকি রাজীবের সঙ্গে তৃণার বিয়ের নিমন্ত্রণের কার্ড নিয়ে তৃণার ছায়াসঙ্গী ছিল শাম্ব, রাজীবের হত্যার পর তুষার যখন তৃণাকে বিয়ের জন্য শাম্বকে অনুরোধ করিয়ে রাজী করায় তখন ধাক্কাটা আসে মায়ের কাছ থেকেই। কোনভাবেই তৃণা ও তুষারের মা একজন সিডিউল কাস্ট ছেলে শাম্বর সঙ্গে তৃণাকে বিয়ে দিতে রাজি নয়। তৃণার মায়ের সোজা সাপ্টা কথা 'আমার মেয়ে লগ্ন ভ্রষ্টা হয়ে বেকায়দায় পড়েছে বলে কি একটা নমঃশূদ্রের ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে ? সংস্কার আর কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসা যে অত সহজ নয়, 'নিহিত অন্ধকার 'গল্পে বিকাশ সরকার খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন পাঠকদের কাছে। যদিও শেষ পর্যন্ত তৃণার ইচ্ছাতেই তৃণার এতদিনকার লুকানো প্রেম পরিপূর্ণতা পায়, বিয়ে হয় শাম্ব ও তৃণার।

        'উমিয়ামের জন্ম ' গল্পও 'নিহিত অন্ধকার ' গল্পের মতোই একটি কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ের প্রেমের গল্প । কৌশিকী ও বিতস্তা দুই বান্ধবী। কৌশিকী একেবারে অজ পাড়াগাঁয়ের গরীব ঘরের সন্তান, অন্যদিকে বিতস্তা ধনীর দুলালী। প্রথম দিন থেকেই দুজনের বন্ধুত্ব জমে যায়। এদিকে বিতস্তা একই কলেজের সাইন্স স্টুডেন্ট শৌভিকের প্রেমে পরে। কিন্তু কোনভাবেই শৌভিককে বলা হয় না। কৌশিকী দায়িত্ব নেয় দুজনকে এক করে দেওয়ার। ইতিমধ্যে সুযোগও এসে যায়। কলেজ থেকে উমিয়াম হোজাইয়ের উমিয়াম জলাশয়ের পাড়ে পিকনিকে যাওয়ার কথা ঠিক হয়। পিকনিক স্পটে যাওয়ার পর কৌশিকী বেশ কয়বার চেষ্টা করে বিতস্তা ও শৌভিককে একান্তে কথা বলার সুযোগ করে দিতে। একটা সুযোগ পেয়ে কৌশিকী গানের আসর বসানোর ছল করে অন্য বন্ধুদের খানিকটা দূরে সরিয়ে নেয়। বিতস্তা কিছু বলার আগে শৌভিকই বিতস্তাকে কথা বলার জন্য ডেকে নিয়ে যায় একটু নিরিবিলি জায়গায়। শৌভিককে মনের কথা বলতে পারবে ভেবে আহ্লাদিত হয় বিতস্তা। কিন্তু নাটকীয়ভাবে শৌভিক বিতস্তার হাতে একটি চিঠি দিয়ে বলে সে কৌশিকীকে ভালোবেসে এই চিঠি লিখেছে। চিঠিটা কৌশিকীকে দিয়ে ওর মতামত জানাতে বলবে। এই গল্পেও  বিকাশ কথোপকথন এবং হোজাই জোয়াই অঞ্চলের নৈসর্গিক প্রকৃতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে অত্যন্ত মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।

         রাজনীতির লোকরা যে ধূর্ত ও কৌশলী হয় তা গল্পকার বিকাশ সরকার 'আলোকবর্ষ দূরে 'গল্পে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গ্রামের সাদাসিধে ছেলে টেনেটুনে মাধ্যমিক পাশ করা তুষ্ট মণ্ডল এস সি রিজার্ভেশনের সুবাদে পঞ্চায়েতের একটি ওয়ার্ড থেকে পাশ করে পঞ্চায়েত সভাপতি বনে যায়। বিয়ে করে পার্টি নেতা নিতাই চক্রবর্তীর মেয়ে স্বপ্নাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে । ধীরে ধীরে স্কুটার বাইক ওমনি গাড়ি সহ কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন ।  পর পর দুবার জিতে রাজনীতিতে অনেকটা পরিপক্ক। কিন্তু বিয়ের দশ বছর পরও ছেলে মেয়ের মুখ দর্শন করতে পারেনি। স্ত্রীকে নিয়ে বেশ কয়বার ডাক্তারের কাছে গেছেন। ডাক্তারের বক্তব্য স্বপ্নার কিছু শারীরিক ত্রুটির জন্য স্বপ্না মা হতে পারছে না। দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসা করতে হবে। এদিকে তুষ্টর মায়ের সঙ্গে স্ত্রী সপ্নার অর্থৎ শাশুড়ী বৌয়ের সম্পর্ক এসে দাঁড়ায় সাপে নেউলে। রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তুষ্টর বিরুদ্ধে। আসন্ন নির্বাচনে গোহারা হারবে তুষ্ট তাতে কোন সন্দেহ নেই। এক ঢিলে দুই পাখি মারতে বাজি রাখতে চায় স্বপ্নাকে। সুপারি কিলারের সঙ্গে চুক্তি হয়। তাদের বুঝিয়ে বলে অমনি গাড়ি নিয়ে সে  স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবে। গাড়িটা কিছুটা ফাঁকা জায়গায় রেখে ডাক্তারের কাছে গেলেই সুপারিরা যাতে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে গাড়িটা উড়িয়ে দেয়। সুপারিদের আশ্বস্ত করে গাড়িতে ড্রাইভার থাকবে না, তুষ্ট নিজেই ড্রাইভ করে নিয়ে যাবে এও বুঝিয়ে বলে সহানুভূতি ভোট পাওয়ার জন্যই তার এই প্লান । কথামতো স্ত্রী স্বপ্নাকে নিয়ে গাড়ি করে বেরিয়ে পড়ে। নিদ্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে স্ত্রী স্বপ্নাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে  বলে তুমি গাড়িতো বসো আমি রিপোর্ট নিয়ে চলে আসছি। স্বপ্না যখন বলে ডাক্তার দেখানোর কথা তখন তুষ্ট বলে ডাক্তার আজ চেম্বারে নেই। তাই তুমি খানিকক্ষণ বসো আমি এক্ষুনি আসছি। আসলে তুষ্টের আসল উদ্দেশ্য ছিল ওর গাড়িতে হামলা হয়েছে দেখিয়ে সহানুভূতি ভোট পাওয়া অন্যদিকে স্ত্রী স্বপ্নাকে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় করে পারিবারিক শান্তি ফিরিয়ে আনা। যেটা বলতে চাইছিলাম রাজনীতির লোক কত ধূর্ত  ও অসৎ গল্পকার তা দেখিয়েছেন তুষ্ট -র চরিত্রের মাধ্যমে। যদিও নাটকীয়ভাবে গল্পকার স্বপ্নাকে বাঁচিয়েছেন শেষ পর্যন্ত। 

          শেষ গল্পটি ' ওল্টানো ফোটোগ্রাফ ' ।  ওল্টানো ফটোগ্রাফ মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ভৌতিক গল্প । গল্পকারের গল্প বলার ঢঙের সত্যিই প্রশংসা করতে হয়।ছোট্ট হলেও গল্প শেষ অব্দি পাঠককে টেনে নিয়ে যায়।‌

           সবশেষে বলতে হয়, বিকাশের লেখার মধ্যে আমরা খুঁজে পাই ভিন্নধর্মী এক গল্পকারকে। যিনি স্বভাবতই এক স্বতন্ত্র পথের পথিক।

        বিকাশ সরকারের গল্পগ্রন্থ ১ প্রকাশিত হয়েছে স্রোত প্রকাশনা থেকে। ২০২২সালে কলকাতা বইমেলায়। বইটির সুন্দর প্রচ্ছদ করেছেন দেবাশীষ সাহা,। বইটি উৎসর্গ করেছেন বন্ধুপ্রতিম চার অগ্রজ সর্বশ্রী শিশির রায় নাথ,  সুদীপ মজুমদার, সুশান্ত নিয়োগী এবং মৈনাক ভট্টাচার্য্যকে । বইটির বিনিময় মূল্য ২৫০/-