সময়ের গল্পে-শ্যামল বৈদ্য || সিক্তা চক্রবর্তী 

সময় নদীর স্রোতের মতো। সে কখনো কারোর জন্য থামে না। আপন গতিতে চলতে থাকে। আর সেই সময়ের স্রোতেই মানুষ এগিয়ে চলে। আর এগিয়ে চলতে চলতে যুগে যুগে মানুষের জীবনযাত্রার গতিপথ বদলে যায়। বদলে যাওয়া গতিপথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলেছে সাহিত্য। সাহিত্যে মানুষের জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের তাবড় তাবড় লেখকদের লেখায় সমকালীন মানুষের জীবন যাত্রার চালচিত্র ধরা দিয়েছে। দেশভাগ, দাঙ্গা, মন্বন্তর, দারিদ্রতা কোনকিছুই বাদ পড়েনি। সবকিছু ই লেখকদের গল্প উপন্যাসের উপজীব্য হয়ে উঠেছে। 
লেখক শ্যামল বৈদ্যের লেখনিতে এর ব্যতিক্রম নেই। লেখক শ্যামল বৈদ্য ত্রিপুরা র স্বনামধন্য গল্পকার ও উপন্যাসিক। 
তাঁর লেখা এই বই টিতে পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থা য় মানুষের জীবনের সূক্ষাতি সুক্ষ দিকগুলি তুলে ধরেছেন। 
প্রথম গল্প অচেনা দিগন্তে, একটি মেয়ে সুদীপ ভেবে আরেকটি ছেলেকে ফোন করত। ছেলেটা বারবার বলা সত্বেও ছেলেটি না যাওয়ায় মেয়েটা সুইসাইড করল। পরে ছেলেটি হাসপাতালে তাকে দেখতে গেলে আসল সুদীপের সাথে দেখা। গল্পকারের সার্থকতা এখানেই। পুরো গল্প টায় আসল সুদীপের দেখা নেই। কিন্ত শেষটাতে সুদীপের দেখা। এখানেই আসল চমক লেখকের। 
চেনা অচেনা, গল্পটি মনে হয়েছে আমাদের কথাই লেখক বলেছে। প্রায়শঃই অনেক চেনা মানুষকে ভুলে যাই। গল্পের প্রধান চরিত্র বয়স্ক লোকটি কিছুতেই মনে করতে পারছে না। যার অসুস্থতার খবর দিয়ে গেল ছেলে। ওর বাবা গুরুদাস ভট্টাচার্য উনাকে দেখতে চেয়েছেন। তিনি হসপিটালে শয্যাশায়ী। এই গুরুদাস ভট্টাচার্য কে কিছুতেই মনে করতে পারেন নি। এদিকে সাধুদা অনেকদিন ধরে ওদের আড্ডায় আসেন না। এই নিয়ে চিন্তিত। তবু অবসর সময়ে এই কথাটা মাথায় ঘোরপাক খায় গুরুদাস ভট্টাচার্য কে? কিছুতেই মনে পড়ে নি। যেদিন সবার সাথে একজনের শেষকৃত্যে যাচ্ছেন তিনি নিজে জানেন না। কাকে দেখবেন। সবাই দু:খ করছেন। তিনি তাদের পিছনে চলছেন। সামনে গিয়ে যাকে দেখলেন তিনি আর কেউ নন সাধুদা। এত কাছের মানুষ। থমকে গেলেন তিনি। সাধুদা র আসল নাম গুরুদাস ভট্টাচার্য। লেখকের বিশেষত্ব এখানেই। 
ভীমসেন, গল্প পড়ে মনে হয় এই তো সেদিন পাহাড় লাইনে গাড়ি সারি বেধে দাড়িয়ে থাকত। মনে করিয়ে দিল পালাগানের কথা। 
সুধন গাড়িতে উঠে পালার ডায়লগ মূখস্ত করে। শেষ পর্যন্ত গাড়ি নষ্ট হ ওয়া য় রাতে গাড়ি নিয়ে বেরোতে না পেরে সুধন সবাই কে পালাগান দেখাতে নিয়ে গেলো। গ্রামের মানুষের যে প্রতি ভা রয়েছে ভীমসেন তাঁর  প্র মাণ। গল্পের নামটিও যথেষ্ট আকর্ষণীয়। 
কোভিড নিয়ে লেখা যদিদ;হৃদয়;মম, গল্পটি তে মানুষের মানসিক অবস্হা এবং সম্পর্কের নানা দিক গুলি তুলে ধরেছেন। 
পেডেল গল্পটা তে মানুষ ও পশুর মধ্যে বিশেষ করে এই পোষা কুকুর গলির সঙ্গে মালিকের যে সম্পর্ক বিশেষভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। মালিক কে দেখতে না পেয়ে খাওয়া ছেড়ে বসে থাকা। যখন মালিককে পেলেন ওর সেকি আনন্দ। গল্পটা পড়ে একটা জায়গায় চোখ ভিজে ওঠে। যখন কুকুর টি খাওয়া ছেড়ে দেয়। আমাদের পোষা কুকুর টির কথা মনে পড়ে। সে আজ আমাদের মধ্যে নেই। এখানেই উনার সার্থক তা। 
ব ইটি তে উনিশটি গল
প রয়েছে। এর মধ্যে দুটো অলৌকিক গল্প ও রয়েছে। 
উনিশ টি গল্পই পাঠককে আকর্ষণ করে। 
মানুষের জীবনের সাধারণ ঘটনাগুলি অসাধারণ হয়ে ওঠে উনার লেখনীতে। গল্প বলার ধরণ ভাষারীতি ও বুনন সব মিলিয়ে এককথায় অনবদ্য।
লেখক শ্যামল বৈদ্য  উনার ছোটগল্প ও উপন্যাসে ইতিমধ্যেই অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। লেখনীর স্বকীয়তায়উনি সাহিত্য জগতে বিশেষ মর্যাদায় আসীন। কিছুদিন আগে তার সাহিত্যের অবদান হিসেব সুবিমল রায় স্মৃতি পুরস্কার পান। 
স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত বই টির মূল্য পাচশো টাকা। 
ব ই টির গুণমান উৎকৃষ্ট। বানান বিভ্রাট চোখে পড়েনি।  প্রচ্ছদ ও প্রিন্টিং ভালো হয়েছে। ব ইটির গল্প সম্ভার পাঠককে আকৃষ্ট করবে।