ঋতুরঙ্গের গল্পসল্প

রাহুল সিনহা 

আত্মবিষ ও আত্মতৃপ্তির মধ্যেকার এক উপত্যকার নামই কবি চিরশ্রী দেবনাথের কাছে কবিতার অন্য নাম।
এই মধ্যবর্তী কল্পপৃথিবীতে কবি আসলে একা। সেখানে বুঁদ হয়ে থাকে তার প্রেম, অভিমান, শৈশব, যৌনতা, ক্ষোভ যা প্রতি ঋতুতে রঙ বদলায়। চিরশ্রীর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্হ  "ঋতুক্ষরণের রোদচশমায়" সেই ভাবনার ক্যানভাস যাতে মিশেছে তাঁর শব্দের রামধনু।
অামরা কি অাজকাল ছয় ঋতুকে দেখতে পাই? পাই না। কিন্তু চিরশ্রীর রোদচশমার ওপারে সব ঋতুই ধরা পড়ে তাদের স্পর্শাতীত রোদ, আর্দ্রতা, পেলবতা, শস্যখেতের হলুদ, শীতঘুম অার পলাশের বর্ণবাহার নিয়ে।
গোটা বইটিকে ছয় ভাগেই সাজিয়েছেন কবি। বালিবর্ষা, দেবীশরত্, হেমন্ত ধান, চন্দন শীত, বসন্ত ধুলো অার চূর্ণ গ্রীষ্ম। অার প্রতিটি ঋতুর সঙ্গে বদলে গেছে তার রোদচশমার অাড়ালে থাকা কবিদৃষ্টি। আর আঁকা হয়ে গেছে কিছু অদ্ভুত চিত্রকল্প।  যেমন 
" সব বৃষ্টি শেষ হলে তবেই না খটখটে দিন
   ভেজা পার্স পড়ে অাছে
  টাকা কয়েন পরিচয়পত্র সব উড়ে গেছে নিজস্ব ঠিকানায়..."
কিংবা হঠাত্ই পেয়ে যাই এক কাব্যিক রাজনৈতিক বক্তব্য " পৃথিবীর সব বিপ্লবেই মিশে থাকে প্রেম"। অাবার কোথাও অাছে এক অনি:শেষ প্রতীক্ষা  " অাগাছার মতো প্রহর গুনি/ পলি ঢেউ কি নিয়ে অাসবে!"। অাছে প্রতিবাদের এক দৃপ্ত সুরও " দেবতাদের বড়  স্খলনের ভয়.... বয়ে যাচ্ছে ঋতুস্রাব,  মন্দিরে ঢুকো না এখন মেয়ে..."
সেই প্রতিবাদেই থাকে কবির অহংকার,  যে অহংকারে ঘাতককে কবি বলে দেন, " মৃত্যুদণ্ড কবিতাকে অমর করে..."।
কিন্তু এই সব কিছুর পরেও চিরশ্রীর কবিতার স্থায়ী সুর তার চিত্রকল্প,  তার অপার্থিব সৌন্দর্যচেতনা,  বেদনাবোধ অার তৃষা।  এসবই তাকে প্রগল্ভা করে, কবি তখন বেছে নেন নিজের পছন্দের কাজ " সব প্ল্যাটফর্মে অামি তাই একাই এখন রঙ শ্রমণী।" এসব রঙ অার ছবিই অক্ষরে এঁকে গেছেন চিরশ্রী এই কাব্যগ্রন্হের পাতায় পাতায়, যে ছবি অনেকটা সময় ধরে একা একা পড়তে হবে, ডুবে যেতে হবে, ভেসে উঠতে হবে। সঙ্গে কবির নিজেরই অাঁকা একটি মায়াময় প্রচ্ছদ। শুধু  কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ও বানান বিভ্রাট পাঠসুখে ছেদ ঘটায়। প্রকাশকের এদিকে যত্নবান হওয়া উচিত ছিল।
 
" ঋতুক্ষরণের রোদচশমায়" 
কবিতা ও প্রচ্ছদ চিরশ্রী দেবনাথ।