হারাধন বৈরাগী ||আমার তংকোল্মা মেয়ে
হারাধন বৈরাগী
আমার তংকোল্মা মেয়ে
তং মানে 'টিলা বা মগ' আর কোল্মা মানে 'বাঙালি'।মগ ও বাঙালি উভয় জিন বহন করে যে সে-ই 'তংকোল্মা'। ভবানী বিশ্বাস,দক্ষিণ ত্রিপুরার মেয়ে, আমার 'খুকি'।লেখায় যার অসম্ভব হাত।আমার তংকোল্মা মেয়ে। আমার তংকোল্মা মা ।এখনও সরাসরি দেখা হয়নি যার সাথে, যখন বাতাসে আমাকে বাবা বলে ডাকে।তখন আমার বুকটা ঝর্ণার মতো ঝর ঝর করে ঝরে পড়ে। আমার বুকটা গর্বে ভরে ওঠে।ওর সহজ সরল প্রাণলেপা লেখার হাত আমাকে অসম্ভব স্পর্শ করে।এখানে ভবানীর দুটি কবিতা উল্লেখ না করে পারছি না।
সংসার
আমার ক্লান্ত প্রাণের আশ্রয়স্থল বাবার বুক।
যবে থেকে আমার ওজন বাড়লো
বাবা আমাকেও গুনতে শুরু করে।
দিনশেষে বাবার মুখের ক্লান্ত ডাক শুনে
আমার বুকেও বাজ পড়ে।
বাবার কপালের ঘাম এখন আমারও গা বেয়ে পড়ে,
কন্টকময় পথে বাবা আর আমি হাঁটছি
আমার পায়ের রক্ত দেখে বাবার চোখে নদী নামে,
আর আমি বুকচাপা দিয়ে আটকে রাখি আমার নোনাজল।
নদী আর নোনাজলের মিশ্রণে আমাদের ঘরে ভাত হয়।
মা পরম যত্নে আমাদের সেই ভাত বেড়ে দেয়।
যুদ্ধাবসান
আমরা একই ডিএনএ বাহক
কিন্তু চিন্তাধারা বিপরীত মেরুতে,
যদিওবা অন্তরের টান অতুলনীয়।
আমাদের দুজনের অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে যে বিদ্ধ হয়
সে আমার মা।
আজীবন দুঃখপোষা নারীটার আজও সুখ হলো না।
মায়ের চোখে বন্যা দেখে আমাদের মন গলে না।
এ যুদ্ধ অতীত থেকে চলে আসছে, চলছে।
আমি ভোর রাতে স্বপ্ন দেখি
মায়ের বন্যা একদিন নদী হল,
সেই নদী হলো গঙ্গা।
আমি আর বাবা গঙ্গার পবিত্র জলে ডুব দিয়ে যুদ্ধের ইতি টানবো।
এই হলো ভবানী নামের আমার তংকোল্মা মায়ের কবিতা। আমার কবিতা মেয়ের কবিতা-----!এরপর কি আর কবিতা হয়,নাকি হয়না।আমি জানিনা। আমার বিশ্বাস একদিন কবিতার ব্রুইফাং হবে ভবানী!!
এই মেয়ে ,আমার আত্মাবলী "হৃদয়ে রাইমা"পাঠ করে আজ প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করছে।বাবা হিসাবে আমাকে সে অনেক ক্ষমা করেছে।এ আমার জীবনের সেরা পাওনা,আমার তংকোল্মা খুকির কাছ থেকে!আমার কবিতা মায়ের কাছ থেকে।
পাঠপ্রতিক্রিয়া(হৃদয়ে রাইমা)
"তোমার বই 'হৃদয়ে রাইমা' আজ পড়ে শেষ করলাম।পড়া শেষ করতে দেরি হল কারণ পরীক্ষা গতকাল শেষ হলো। পরীক্ষার মধ্যেও অর্ধেক পড়েছি যতদিন পড়া হয় নি ততদিন শুধু মনে খোঁচা দিচ্ছিলো বইটা।
কারণ এমন লেখাই আমার পছন্দ।পড়ার সময় একদম একঘেয়েমি লাগেনি। পড়তে পড়তে আমিও চলে গিয়েছিলাম জগবন্ধু পাড়ায়। সেখানে সাহেব ,চিকলি ,তোমার স্কুল, পান দোকান ,তোমার রান্না খাবার বিশেষ করে বাঁশকুঁড়ুল,গোদক আর মৌরালামাছের চচ্চড়ি,সব যেন জীবন্ত আমার চোখের সামনে।বাঁশকুঁড়ুল নিয়ে রসিকতাগুলো খুব আনন্দ দিয়েছে।
হয়তোবা এখানে কল্পনা মিশ্রিত ছিল কারণ, সাহিত্যিকের লেখা বাস্তবের সাথে কল্পনা মিশ্রিতও হয়।কিন্তু আমার কাছে সবটা বাস্তব বলেই মনে হয়েছে।
ওইরকম একটা পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়ানো,তোমার স্ট্রাগল, নিজের মনকে সংযত রাখা এইটা আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে।কারণ একটা মানুষ খারাপ দিকে ঝোঁক দেওয়ার জন্য ওই পরিবেশে যথেষ্ট ছিল। তোমার প্রতি গর্বও হয়েছে।
কখনো কখনো তোমার জন্য ভয়ে আতঙ্কিত ছিলাম,কখনো গর্ব করছিলাম,আবার কখনো কখনো হিংসাও হয়েছে তোমার উপর।কারণ কত সুন্দর জায়গা,সেখানকার মানুষ,তাদের সংস্কৃতি কতকিছু দেখলে জানলে অথচ আমি..😔,সেইজন্য হিংসা হয়েছে।
আবার তোমার সাহসকে ধন্যবাদ না দিয়েও পারলাম না।গাড়ি বিকল হওয়ার কীভাবে জঙ্গলের ভিতর চলে গেলে আরও ওইরকম একটা খারাপ পরিস্থিতিতে। যদি কিছু হয়ে যেত। পরবর্তীতে এমন কাজ করতে সাবধান কিন্তু বাবা।
জঙ্গলের প্রতি তোমার সন্তানসম টান স্নেহ ভালোবাসা আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে।মোটের উপর তোমার বইটা আমার খুব ভালো লেগেছে বাবা।"
আমার প্রণাম নিও।
ভবানী বিশ্বাস
0 Comments